দুর্বল ব্যাংকগুলো অবসায়নের জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করে এই ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়। অথচ ব্যাংকগুলোর দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুরোধ উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া ওই পদক্ষেপ নতুন করে পর্যালোচনা করে দেখবে নির্বাচিত সরকার—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিভিন্ন পর্যায়ের ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানতে পারে বাংলানিউজ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হন ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি এসেই বিগত সাড়ে ১৫ বছরে অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।
বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু তার আয়ত্তে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে একীভূতকরণের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত শরিয়াভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় পড়ে যায়। ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। একীভূত করে গঠিত নতুন ব্যাংকের নাম দেওয়া হয় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’।
এই ব্যাংকটিকে সরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচালনার জন্য বিশাল আয়োজন শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইতোমধ্যে সব আয়োজন শেষ করে সীমিত পরিসরে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ নামে একটি আইন পাস করতে হয়। ওই আইনের ৩৩ ধারায় মূলধন ও যোগ্য দায় হ্রাস এবং/অথবা রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রয়েছে। ওই নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেন গভর্নর। বিএসইসি মনে করে একটি শেয়ারের বাজারমূল্য কখনও শূন্য হতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রক্রিয়ায় এই শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেছে, তা বিএসইসি কখনওই সমর্থন করেনি। বরং বিএসইসি আগেই চিঠি দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি তা লিখিত আকারে জানিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে ভ্রুক্ষেপ করেনি। গত বছরের ৫ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে ৫ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য শূন্য হবে বলে ঘোষণা দেন আহসান এইচ মনসুর। পরের দিন ৬ নভেম্বর শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়। বলা হয়, সরকার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বিশেষ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
এরও দুই দিন পর (৯ নভেম্বর) তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা ‘চূড়ান্ত নয়’। এটা তারা দেখবেন বলেও উল্লেখ করেছিলেন অর্থ উপদেষ্টা। তবে এরপর আর বিষয়টি এগোয়নি।
নভেম্বরের ৩০ তারিখ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন পায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এই ব্যাংক পরিচালনায় নতুন ব্যাংকটির মোট পেইড-আপ ক্যাপিটাল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা এসেছে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে।
জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমানতকারীদের শর্তসাপেক্ষে টাকা তুলতে দিচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে শেয়ার কেনা বিনিয়োগকারীদের খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের শেয়ারধারী বিনিয়োগকারী মোহাম্মাদ জামাল উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা তো সামান্য মুনাফার আশায় সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে শেয়ার কিনেছিলাম। শেয়ার কেনা তো অন্যায় নয়। এখন হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে শেয়ার ভ্যালু শূন্য হয়ে গেছে। যারা ব্যাংক লুটপাট করেছে এটা তাদের দায়। তাদের দায় আমরা কেন নেব?’
এটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া একটি সিদ্ধান্ত এবং বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে করেন মোহাম্মাদ জামাল উদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। আমি চাইবো নতুন সরকার বিষয়টি পুনঃপর্যালোচনা করে দেখবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিয়েছিল বিএসইসি।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া চিঠিতে বিএসইসি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে ৫টি বিষয় জরুরি বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংককে।