‘এহন আমার এই ছোট ছোট দুইডা বাচ্চা নিয়ে কি করবো? ওর বাপ দাদা সব গেলো। ’ ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত তাহাজ্জুদ হোসেনের স্ত্রী সুমি বেগম।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নড়াইল সদর উপজেলার সিংগাশোলপুর ইউনিয়নের বড়কুলা গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলা ও পাল্টা হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন তাহাজ্জুদ হোসেন ও তার বাবা খলিল। অপর নিহতরা হলেন- ফেরদৌস হোসেন এবং সাবেক চেয়ারম্যান খায়ের গ্রুপের ওসিবুর মিয়া, যিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৮টার দিকে মারা যান।
এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। তারা খুলনা, যশোর ও নড়াইল সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুপুর পর্যন্ত পাঁচজন নিহতের খবর ছড়ালেও সন্ধ্যায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড়কুলা গ্রামের মাঝখান দিয়ে পাকা সড়ক।
দুই পাশে সবুজ ধানক্ষেত, ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর। জনবসতি তুলনামূলক কম। পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। খলিল শেখের বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর পড়ে ছিল তার লাশ। কিছু দূরে একইভাবে পড়ে ছিল ফেরদৌস হোসেনের মরদেহ।
বাড়ির ভেতর উঠানে পড়ে ছিল তাহাজ্জুদ হোসেনের লাশ। তাহাজ্জুদের বোন ও ফুফুসহ স্বজনদের দাবি, খয়ের চেয়ারম্যান ও তার সহযোগীদের ফাঁসি দিতে হবে। স্বজনদের ভাষ্য, প্রায় চার কিলোমিটার দূরের তারাপুর গ্রাম থেকে খয়ের চেয়ারম্যানের লোকজন বড়কুলা গ্রামে এসে ঘর থেকে বের করে তিনজনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। কীভাবে এত দ্রুত সবকিছু ঘটল, তা বুঝে উঠতে পারেননি তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা ওরফে খয়ের, অন্য পক্ষে আছেন সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখ, তার বাড়ি গোবরা গ্রামে। বর্তমানে শেখ বংশের নেতৃত্বে ছিলেন তারাপুর গ্রামের খলিল শেখ।
এলাকাবাসী জানান, গত ২০ বছরে দুই পক্ষের মধ্যে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ বার সংঘর্ষ হয়েছে। এর আগেও একাধিক হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে।
খলিল শেখের পরিবারের সদস্যরা জানান, খয়ের চেয়ারম্যানের অত্যাচারে টিকতে না পেরে প্রায় ১০-১২ বছর আগে তারা তারাপুর গ্রাম থেকে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে একই ইউনিয়নের বড়কুলা গ্রামে বিলের পাশে বসতি গড়েন। তাদের সঙ্গে আরও তিনটি পরিবার সেখানে চলে আসে। দূরে থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে রেষারেষি, মামলা-মোকদ্দমা ও হামলা-পাল্টা হামলা চলছিল।
মাসখানেক আগে একটি মামলায় হাজিরা দিতে নড়াইল আদালতে যাওয়ার পথে চুনখোলা মোড়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে আটজন আহত হন।
স্থানীয়রা জানান, সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা ও উজ্জ্বল শেখ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তাদের কোনো পদ নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি একবার একই মঞ্চে বসিয়ে তাদের বিরোধ মিটিয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় তারা ওই এমপির ছত্রছায়ায় ছিলেন।
তবে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তারা আবারও সক্রিয় হন। বর্তমানে উজ্জ্বল শেখ একটি মামলায় কারাগারে আছেন।
সংঘর্ষের খবর পেয়ে সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বেলা ১১টার দিকে খলিল শেখের বাড়িতে যান। তিনি নিহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং উপস্থিত পুলিশ সুপার, সেনাবাহিনী ও র্যাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করবে। কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না।
পুলিশ প্রশাসন জানায়, সুরতহাল শেষে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য নড়াইল সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গ্রামজুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
উসকানিদাতা রনি আটক এ ঘটনায় র্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের সদস্যরা রনি সিকদার নামে একজনকে আটক করেছে। তিনি বড়কুলা গ্রামের আমিন সিকদারের ছেলে।
ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর এটিএম ফজলে রাব্বি প্রিন্স আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সংঘর্ষে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রনি অন্যতম। তার উসকানিমূলক তৎপরতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আরও চার-পাঁচজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
নড়াইলের পুলিশ সুপার আল মামুন শিকদার বলেন, নতুন করে সহিংসতা এড়াতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন শান্ত, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।