বাংলা পপ সংগীতের ইতিহাসে ফেরদৌস ওয়াহিদ একটি ধ্রুবতারার নাম। তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে গত দুই দশকে বাংলা গানের ভোল বদলে দিয়েছেন হাবিব ওয়াহিদ। শ্রোতাদের মনে পাকাপোক্ত জায়গা করে নেওয়া হাবিবকে অনেকেই সমকালীন ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে আখ্যা দেন। তবে ছেলের এই আকাশচুম্বী সাফল্যে গর্বিত হলেও ‘কিংবদন্তি’ বা ‘লিজেন্ড’ তকমাটি নিয়ে একেবারেই ভিন্ন মত পোষণ করেন স্বয়ং ফেরদৌস ওয়াহিদ। তাঁর মতে, হাবিবের পথচলা কেবল শুরু, সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে হলে পাড়ি দিতে হবে আরও দীর্ঘ পথ।
‘লিজেন্ড’ তকমা ও ডুবন্ত জাহাজের সতর্কতা সম্প্রতি একটি ঘরোয়া সাক্ষাৎকারে ছেলের ক্যারিয়ার ও জনপ্রিয়তা নিয়ে অকপট কথা বলেছেন বর্ষীয়ান এই শিল্পী। ফেরদৌস ওয়াহিদ স্পষ্ট ভাষায় জানান, হাবিব যদি এখনই নিজেকে লিজেন্ডারি কেউ মনে করতে শুরু করেন, তবে সেটি হবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ভাবনা। তিনি বলেন, “হাবিব যদি এখনই কোনো লিজেন্ডারি পুরস্কারে ভূষিত হয়, তবে সেটা ওর জন্য হবে একটি ‘ডুবন্ত জাহাজের’ মতো। কারণ, এই তকমা পাওয়ার পর মানুষের শেখার আগ্রহ মরে যায়।”
ফেরদৌস ওয়াহিদ মনে করেন, একজন শিল্পীকে কিংবদন্তি হয়ে উঠতে হলে অন্তত তিন থেকে চার দশকের নিরবিচ্ছিন্ন সাধনা এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। তাঁর মতে, হাবিবের বর্তমান বয়স ও ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি এখনই তাঁকে কিংবদন্তির কাতারে ফেলার জন্য যথেষ্ট নয়। আরও অন্তত ত্রিশ-চল্লিশ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পরেই হাবিব নিজেকে এই সম্মানের যোগ্য দাবিদার হিসেবে ভাবতে পারেন বলে মনে করেন তাঁর বাবা।
শৈশব ও সুরের নেশা হাবিবের শৈশব নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, সুরের আবহে বেড়ে ওঠা হাবিবের রক্তে মিশে ছিল মিউজিক। মাত্র দুই-আড়াই বছর বয়সেই হাবিব বাবার মিউজিক রিহার্সালের সময় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে খেলা করতেন। সেখান থেকেই বাদ্যযন্ত্রের প্রতি তাঁর এক সহজাত আকর্ষণ তৈরি হয়। তবে আজকের এই সফল হাবিবের পেছনে নিজের মেধার পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা, মায়ের দোয়া এবং বাবার নিরলস সহযোগিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি এই প্রবীণ শিল্পী।
গায়ক নয়, হতে চেয়েছিলেন মিউজিক কম্পোজার আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের কাছে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় হলেও হাবিবের প্রাথমিক লক্ষ্য গায়ক হওয়া ছিল না। ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, হাবিব সবসময়ই একজন দক্ষ সুরকার ও মিউজিক কম্পোজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ভাগ্যচক্রে এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ান এবং তাঁর সেই অনন্য গায়কী শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে যায়। অর্থাৎ, তাঁর গায়ক সত্তার চেয়েও সংগীত পরিচালনার প্রতি অনুরাগ সবসময়ই বেশি ছিল।
অস্থির সময়ে হাবিবের ‘পারফেকশন’ ও স্থৈর্য বর্তমান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে যখন দ্রুত গান প্রকাশের এবং সস্তা জনপ্রিয়তার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে হাবিবের ধীরস্থির মনোভাবের প্রশংসা করেছেন ফেরদৌস ওয়াহিদ। তিনি বলেন, “বর্তমান এই অস্থির সময়ে হাবিবের মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, এটি বাবা হিসেবে আমাকে খুব স্বস্তি দেয়। খ্যাতির মধ্যগগনে থেকেও ও প্রতিটি কাজে যেভাবে নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করে এবং ‘পারফেকশন’ খোঁজে, তা সত্যিই অসাধারণ।” কাজের প্রতি হাবিবের এই একাগ্রতা ও সততাই তাঁকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে রেখেছে বলে বিশ্বাস করেন ফেরদৌস ওয়াহিদ।
একজন কড়া অভিভাবক হিসেবে ফেরদৌস ওয়াহিদের এই বার্তা আসলে হাবিবের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি চান না সময়ের আগেই প্রাপ্তির পূর্ণতা তাঁর ছেলের সৃজনশীল সত্তাকে থামিয়ে দিক। বরং অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করে হাবিব একদিন সত্যিকারের কিংবদন্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন—এটাই এখন এই প্রবীণ শিল্পীর একান্ত কাম্য।