দক্ষিণাঞ্চলের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণার চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। কোনো স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও নামের পাশে পিজিটি (PGT) ও সিসিডি (CCD)-র মতো উচ্চতর ডিগ্রির তকমা লাগিয়ে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন ডা. মিজানুর রহমান নামের এক চিকিৎসক। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) খুলনা জেলা কার্যালয়ের এক বিশেষ এনফোর্সমেন্ট অভিযানে (Enforcement Drive) এই জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
বিশেষজ্ঞের লেবাসে সব রোগের ‘চিকিৎসক’! অভিযুক্ত ডা. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি দীর্ঘ। তদন্তে দেখা গেছে, তাঁর কোনো স্বীকৃত উচ্চতর শিক্ষা বা বিশেষজ্ঞ সনদ না থাকলেও তিনি নিজের ভিজিটিং কার্ড, সাইনবোর্ড এবং প্রেসক্রিপশন প্যাডে (Prescription Pad) বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। মেডিসিন থেকে শুরু করে নিউরোমেডিসিন (ব্রেন), ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, শিশুস্বাস্থ্য, চর্ম ও যৌনরোগ এমনকি বাতরোগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও তিনি নিয়মিত রোগী দেখতেন এবং ব্যবস্থাপত্র প্রদান করতেন। বিশেষায়িত জ্ঞান ছাড়াই এমন ‘Multidisciplinary’ চিকিৎসা প্রদান রোগীদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে পর্দা ফাঁস খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ দিন ধরে চলা বদলি বাণিজ্য এবং চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগীদের হয়রানি সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করে দুদক। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, অভিযান চলাকালে দুদক টিম ডা. মিজানুর রহমানের নথিপত্র ও প্রেসক্রিপশন যাচাই করে দেখে। সেখানে দেখা যায়, পিজিটি ও সিসিডি ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তিনি তা অবলীলায় ব্যবহার করছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি চেম্বারে নেওয়া এবং সেখানে ভুয়া ডিগ্রির প্রভাব খাটিয়ে মোটা অঙ্কের ফি আদায়ের একটি সুসংগঠিত চক্রের সঙ্গেও তাঁর যোগসূত্র থাকতে পারে।
কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি অভিযুক্ত অভিযান চলাকালে দুদক কর্মকর্তারা ডা. মিজানুর রহমানকে তাঁর কথিত ডিগ্রির স্বপক্ষে মূল সনদপত্র (Original Certificate) প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। তবে তিনি কোনো বৈধ নথি বা সনদ দেখাতে ব্যর্থ হন। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে বিশেষজ্ঞ পরিচয়ের পক্ষে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় প্রাথমিক তদন্তে তাঁর প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক। অভিযানকালে অন্যান্য প্রশাসনিক অনিয়ম ও সরকারি ওষুধ চুরির অভিযোগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্রও সংগ্রহ করেছে তদন্তকারী দল।
কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পথে দুদক সংগৃহীত রেকর্ডপত্র এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বর্তমানে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই জালিয়াতির বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে দাখিল করা হবে। সেখান থেকে অনুমতি পাওয়ার পর অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রতারণা এবং দুর্নীতির অভিযোগে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকের এমন কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিষ্ময় সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার পর সরকারি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নজরদারি এবং চিকিৎসকদের ‘Credential Verification’ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।