উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন ধ্বংসের মুখে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (LGED) আওতাধীন অধিকাংশ পাকা সড়কের কার্পেটিং উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল গর্ত। বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কগুলো এখন সাধারণ পথচারী ও যানবাহন চালকদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক বা 'Death Trap'-এ পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে বারবার মেরামতের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন না থাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিসংখ্যানের আড়ালে ধুঁকছে গ্রামীণ Connectivity নাগেশ্বরী উপজেলায় এলজিইডির অধীনে মোট ৮৩২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে, যার মধ্যে ২০৮ কিলোমিটার সড়ক পাকা বা 'Paved Road'। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ২০৮ কিলোমিটারের মধ্যে ১৭৩ কিলোমিটার সড়কই বর্তমানে চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ, উপজেলার প্রায় ৮৩ শতাংশ পাকা সড়কই এখন জরাজীর্ণ। সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক সড়ক দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একসময় পাকা রাস্তা ছিল। পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে মাটির রাস্তায় পরিণত হয়েছে অধিকাংশ জনপথ।
মৌসুমি বিড়ম্বনা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এই বেহাল সড়কের কারণে ঋতুভেদে দুর্ভোগের ধরন পাল্টায়। বর্ষাকালে গর্তগুলোতে পানি জমে কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে, ফলে রিকশা, ইজিবাইক বা অ্যাম্বুলেন্স চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আবার শুকনো মৌসুমে 'Dust Pollution' বা ধুলোবালির কারণে পথচারীদের শ্বাসকষ্টসহ নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ভঙ্গুর অবকাঠামো বা 'Fragile Infrastructure' চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ভিতরবন্দ ইউনিয়নের বাসিন্দা আরিফ মিয়া তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়কগুলোর অবস্থা এতটাই খারাপ যে, সুস্থ মানুষ এসব রাস্তায় চললে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে আমাদের দ্বিগুণ খরচ গুনতে হচ্ছে।"
নাগেশ্বরী শহরের অটোচালক হাফিজের কণ্ঠেও একই সুর। তিনি জানান, "কুড়িগ্রাম-সোনাহাট প্রধান সড়কটি ছাড়া উপজেলার ভেতরের প্রায় সব রাস্তাই এখন ভাঙাচোরা। ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালালে 'Maintenance Cost' বেড়ে যায়, বারবার টায়ার ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। আমরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি।"
প্রশাসনিক জটিলতা ও আশ্বাসের বৃত্ত সড়ক সংস্কারের এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নাগেশ্বরী উপজেলা প্রকৌশলী আসিফ ইকবাল রাজিব জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে বরাদ্দ বা 'Budget Allocation' না পাওয়া পর্যন্ত সংস্কার কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের এই গৎবাঁধা আশ্বাসকে 'আমলাতান্ত্রিক জটিলতা' হিসেবেই দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
আর্থ-সামাজিক প্রভাব ও আশু করণীয় একটি অঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো উন্নত 'Communication System'। নাগেশ্বরীর এই জরাজীর্ণ সড়ক ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ছে। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে কৃষকরা তাদের পণ্যের সঠিক দাম পাচ্ছেন না পরিবহন সংকটের কারণে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত এই সড়কগুলো মেরামতের উদ্যোগ না নিলে উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন সূচক নিম্নগামী হবে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, শুধুমাত্র কাগজ-কলমে তালিকা সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত 'Field Level'-এ সংস্কার কাজ শুরু করা হোক।