সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ নতুন করে এই বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
একইসঙ্গে আলোচনায় আসছে সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়টিও। গতকাল ওই অভিযানের খবর সংগ্রহের সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে মারধর করেন পুলিশ সদস্যরা। এ সময় গুরুতর আহত হন তোফায়েল আহমেদ। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের আচরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
জানা গেছে, শাহবাগ থানার নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের সংবাদ সংগ্রহের জন্য পুলিশই সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অভিযান শুরুর কিছুক্ষণ পরই তোফায়লে যখন পেশাগত দায়িত্ব পালনে ‘লাইভ’ করছিলেন, তখন হঠাৎ একজন পুলিশ সদস্য তার গলার ‘প্রেস আইডি’ কার্ড ধরে টান দেন এবং মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। এরপর শুরু হয় লাঠিচার্জ। তোফায়েল বারবার নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিলেও একাধিক পুলিশ সদস্য তাকে বেধড়ক মারধর করেন এবং তার ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এ নিয়ে অবশ্য একটি দুর্বল ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম। তিনি বলেছেন, বিষয়টি আসলে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। ঘটনার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। তবে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, অন্ধকারের ভেতর অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি পুলিশকে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশ সেই ব্যক্তির হাত থেকে নিজেকে আত্মরক্ষার জন্য লাঠিচার্জ করে।
সেই লাঠিচার্জের সময় উপস্থিত সাংবাদিকের গায়ে আঘাত লাগে। বিষয়টি আসলে ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, ভুল বোঝাবুঝির হওয়ার কারণে হয়েছে। আর অভিযানে থাকা এক পুলিশ সদস্য চোখে ছুরিকাঘাতের যে চেষ্টা করেছে তাকে পুলিশ খুঁজছে। ঘটনার পরপরই সাংবাদিকের শরীরে আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি, তবুও বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তার এই ব্যাখ্যাকে যুক্তিসংগত মনে করছেন সাংবাদিকরা। তাদের ভাষ্য, একজন সাংবাদিক যখন পুলিশের আমন্ত্রণে কোনো অভিযানের খবর সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে যান, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থাকে। তা ছাড়া সাংবাদিকরা পরিচয় পত্র বহন করেন। তোফায়েলের গলায় তার সংবাদমাধ্যমের আইডি কার্ড ছিল। পুলিশ সেটি ধরে টানাটানি করেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের মনে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। পুরো বিষয়টি তাদের জানাশোনার মধ্যেই হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
সন্দেহের ভিত্তিতে তল্লাশি চালানো যায়, কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই কাউকে অপদস্থ করা বা বলপ্রয়োগ করা কি আইনের অনুমোদিত? বিষয়টি বুঝতে হলে প্রযোজ্য আইনগুলো দেখতে হবে।
বাংলাদেশে তল্লাশির ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া মূলত ফৌজদারি কার্যবিধি এবং পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) দ্বারা নির্ধারিত। আইন পুলিশকে তল্লাশির ক্ষমতা দিয়েছে, তবে তা সীমাহীন নয়। সাধারণত সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তল্লাশি পরিচালনা করতে পারেন। কনস্টেবল এককভাবে তল্লাশি চালাতে পারেন না; তারা কেবল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনায় সহযোগিতা করেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৪ ও ৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো দলিল বা বস্তু উদ্ধারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি বা সার্চ ওয়ারেন্ট প্রয়োজন। আবার ১০২ ও ১০৩ ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো ঘর, ব্যাগ বা বদ্ধ স্থান তল্লাশির সময় স্থানীয় অন্তত দুজন সম্মানিত ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে রাখতে হবে।
তবে ১৬৫ ধারায় একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মনে করেন যে বিলম্ব হলে প্রমাণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাহলে তিনি ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি করতে পারেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং পরে ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে।
গ্রেপ্তার বা আটক অবস্থায় দেহ তল্লাশির বিষয়ে ৫১ ধারা প্রযোজ্য। এতে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তির পোশাক ছাড়া অন্য সামগ্রী পুলিশ জব্দ করতে পারে। তবে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে তার একটি কপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দিতে হবে। ৫২ ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীকে কেবল নারী পুলিশ সদস্যই তল্লাশি করবেন এবং তার শালীনতা রক্ষা বাধ্যতামূলক। পুরুষ সদস্যের মাধ্যমে নারীর দেহ তল্লাশি আইনসম্মত নয়।
জনসমক্ষে কাউকে অপমানজনকভাবে তল্লাশি করা পুলিশের আচরণবিধির পরিপন্থী। আইন প্রয়োগের নামে অপদস্থ করা বৈধতার সীমা অতিক্রম করে।
তল্লাশির সময় নাগরিকেরও কিছু অধিকার রয়েছে। পুলিশ সদস্যের পরিচয় জানতে চাওয়া যায়; সিভিল পোশাকে থাকলে পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক। তল্লাশির সময় নিরপেক্ষ ব্যক্তির উপস্থিতি চাওয়াও অযৌক্তিক নয়। কোনো সামগ্রী জব্দ হলে তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ তালিকা নেওয়ার অধিকার নাগরিকের আছে।
এবার আসা যাক বলপ্রয়োগ বা নির্যাতনের প্রশ্নে। বাংলাদেশের কোনো আইনই পুলিশকে আটক বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে মারধর করার অনুমতি দেয় না। জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, থানায় নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু জনসমক্ষে লাঞ্ছনা বা অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ আইনের পরিপন্থী।
নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ স্পষ্টভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ভয়ভীতি প্রদর্শনও এর আওতায় পড়ে। এই আইনে দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কারও মৃত্যু হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে; আহত হলে ন্যূনতম কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান আছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারায় গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় পালানোর চেষ্টা রুখতে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে আনার পর আর বলপ্রয়োগের সুযোগ নেই। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বেআইনি।
৫৪ ধারা অনুযায়ী, যৌক্তিক সন্দেহ থাকলে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করা যায়। তবে সেই সন্দেহ বাস্তবসম্মত হতে হবে এবং পরবর্তী তল্লাশি বা পদক্ষেপও যুক্তিসঙ্গত হতে হবে।
১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গলেও বলা আছে, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি হলে, যেমন দাঙ্গার সময়, তখন সীমিত পরিসরে লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে তা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
সংবিধানও নাগরিককে সুরক্ষা দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) বলছে, কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না বা নিষ্ঠুর, অমানবিক কিংবা লাঞ্ছনাকর আচরণ করা যাবে না।
যদি কেউ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে একই ২০১৩ সালের আইনের ৫ ধারায় অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এই অপরাধগুলো সাধারণত অ-জামিনযোগ্য। প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জামিন পাওয়া কঠিন হতে পারে। এমনকি প্রত্যক্ষ সাক্ষী না থাকলেও ভুক্তভোগীর জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
সব মিলিয়ে আইন পুলিশের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে স্পষ্ট সীমারেখাও টেনে দিয়েছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন ক্ষমতা প্রয়োগ হয় বিধির মধ্যে থেকে, ব্যক্তিগত ইচ্ছায় নয়।