• দেশজুড়ে
  • পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ১৭ বছর: বিভীষিকা আর দীর্ঘসূত্রতার অবসান চান শহীদ পরিবারগুলো

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ১৭ বছর: বিভীষিকা আর দীর্ঘসূত্রতার অবসান চান শহীদ পরিবারগুলো

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ১৭ বছর: বিভীষিকা আর দীর্ঘসূত্রতার অবসান চান শহীদ পরিবারগুলো

আজ পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস; বিচারের প্রতীক্ষায় আজও প্রহর গুনছেন স্বজনরা, প্রধানমন্ত্রীর ইফতারে উঠবে শহীদ মর্যাদা ও তদন্ত রিপোর্ট বাস্তবায়নের দাবি।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত ও রক্তাক্ত অধ্যায়। পিলখানার নারকীয় সেই হত্যাযজ্ঞের ১৭টি বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোর বুকের ক্ষত আজও শুকায়নি। প্রতি বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি এলেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে সেই বীভৎসতা, লাশের স্তূপ আর প্রিয়জনদের আর্তনাদ। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শহীদ পরিবারগুলো এখন ন্যায়বিচারের আশায় বুক বাঁধছে। তবে তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের মধ্যে জমাট বেঁধেছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশা।

স্মৃতির অ্যালবামে অমলিন প্রিয় মুখ

সেদিন বিদ্রোহ দমনে পিলখানায় ছুটে গিয়েছিলেন তৎকালীন বিডিআরের ঢাকা সেক্টর কমান্ডার (Sector Commander) কর্নেল মুজিবুল হক। কিন্তু উন্মত্ত জওয়ানদের ব্রাশফায়ারে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল তাঁর বুক। তিনতলা থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল তাঁর নিথর দেহ। কর্নেল মুজিবের স্ত্রী নেহরীন ফেরদৌসী আজও সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন।

পুরনো ছবির অ্যালবামে স্বামীর হাসি মুখ খুঁজে বেড়ানো নেহরীন গণমাধ্যমকে বলেন, "আমরা আজও জানি না কেন এই নৃসংসতা ঘটানো হলো। শুধু গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল, কারও কারও জিহ্বা কেটে দেওয়া হয়েছিল। এই দৃশ্যগুলো যখন মনে পড়ে, তখন কেবলই প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হলো? এই ট্রমা (Trauma) থেকে আমরা বের হতে পারিনি, হয়তো কোনোদিন পারবও না।"

একইভাবে বাবাকে হারানোর বেদনা তাড়া করে ফেরে শহীদ মেজর কাজী মোছাদ্দেক হোসেনের মেয়ে কাজী নাজিয়া তাবাসসুমকে। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতৃহারা নাজিয়া বলেন, "যেকোনো মেয়ের কাছে তাঁর বাবা একজন হিরো। আমার বাবাও আমার কাছে হিরো ছিলেন। তাঁর সেই বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে সেদিন তাঁর কফিনবন্দি মরদেহ ফিরে এসেছিল। ১৭ বছর আগের সেই ঘটনা আমাদের চোখে আজও জীবন্ত।"

বিডিআর জওয়ানদের মাঝেও ছিল বীরত্ব: সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম

পিলখানা হত্যাযজ্ঞে কেবল সেনা কর্মকর্তাদেরই প্রাণ যায়নি, অনেক নিরপরাধ বিডিআর সদস্যও প্রাণ হারিয়েছিলেন যারা বিদ্রোহ রুখতে চেয়েছিলেন। এমনই একজন ছিলেন সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম। উত্তেজিত জওয়ানরা যখন সেনা কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হচ্ছিলেন, তখন তিনি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কর্মকর্তাদের রক্ষায়। বিনিময়ে তাঁকেও নির্মমভাবে লোহা দিয়ে পিটিয়ে ও ব্রাশফায়ারে হত্যা করে গণকবরে (Mass Burial) ফেলে দেওয়া হয়। ৩ মার্চ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর ছেলে আশরাফুল আলম হান্নান আজও তাঁর বাবার সেই বীরত্বের স্বীকৃতি চান।

তদন্ত রিপোর্ট ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিশন (Investigation Commission) গঠন করা হয়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সেই তদন্ত সম্পন্ন করলেও তার রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ বা বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই হত্যাকাণ্ডের পুনতদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে।

শহীদ সেনা অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কোহিনূর হোসেন বলেন, "বিগত ১৭ বছরে এই প্রথমবার কোনো প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে ইফতার করতে যাচ্ছেন, যা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। তবে আমাদের মূল দাবি দুটি—শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শহীদ মর্যাদা’ দেওয়া এবং দ্রুততম সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার সম্পন্ন করা। এছাড়া ড. ইউনূসের আমলে গঠিত কমিশনের রিপোর্টটি দ্রুত প্রকাশ করা হোক।"

জাতীয় দিবসের ক্যাটাগরি পরিবর্তনের দাবি

বর্তমানে পিলখানা হত্যাযজ্ঞের দিনটিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ (National Martyrs Day) হিসেবে পালন করা হলেও সরকারি নথিতে এটি ‘গ’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। শহীদ পরিবারগুলোর জোরালো দাবি, এই দিনের গুরুত্ব ও ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা বিবেচনায় একে ‘ক’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হোক।

আজ জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আয়োজিত ইফতারে শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাঁদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বেদনা ও দ্রুত বিচারের দাবিগুলো সরাসরি তুলে ধরতে চান। দেশবাসীও চায়, পিলখানার সেই কালরাতে যারা নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়েছিল, তাদের মুখোশ উন্মোচিত হোক এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে শহীদদের আত্মা শান্তি পাক।

Tags: bangladesh army investigation report prime minister national day pilkhana tragedy bdr massacre army martyrs justice delayed mass burial martyrs families