• আন্তর্জাতিক
  • মোদির ইসরায়েল সফর কেন পাকিস্তানের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ

মোদির ইসরায়েল সফর কেন পাকিস্তানের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
মোদির ইসরায়েল সফর কেন পাকিস্তানের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ

ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যার মধ্যেই ইসরায়েল সফর করছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলের দিকে তেল আবিবে তাকে বহনকারী বিমান পৌঁছায়।

এ সময় তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। মোদিকে স্বাগত জানান ইহুদি প্রধান অঞ্চলটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

২০১৭ সালের পর এই দ্বিতীয়বার ‘মিত্র রাষ্ট্র’ ইসরায়েল সফর করছেন মোদি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তার এই সফর ইসরায়েল-ভারতের মধ্যকার সরাসরি সম্পর্ক জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তারা এও বলছেন, ফিলিস্তিনে অবরুদ্ধ গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিতর্কের মুখে থাকা নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই প্রকাশ্য কূটনৈতিক উষ্ণতা অনেকের চোখে তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফর ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে আরও স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত।

মোদির সফরের আগে নেতানিয়াহু তার মন্ত্রিসভার সঙ্গে বসেন। সেখানে দেওয়া বক্তব্যের সময় তিনি একটি ‘হেক্সাগন অব অ্যালায়েন্সেস’ বা ছয়ভুজ জোট কাঠামোর কথা বলেন। সেখানে ভারতকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রেখে গ্রিস, সাইপ্রাস এবং আরও কিছু আরব, আফ্রিকান ও এশীয় রাষ্ট্রকে যুক্ত করার প্রস্তাব তুলে ধরেন।

তার ভাষায়, লক্ষ্য হচ্ছে তথাকথিত ‘র‍্যাডিকাল শিয়া অক্ষ’ এবং ‘উদীয়মান র‍্যাডিকাল সুন্নি অক্ষ’ মোকাবিলা করা।

এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইসরায়েলের তীব্র সমালোচক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

২০১৭ সালের সফরের পর থেকে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। বর্তমানে ভারত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা।

এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সাইবার নিরাপত্তা। খবরে বলা হচ্ছে, একটি গোপন কাঠামো চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল পূর্বে সীমিত সামরিক প্রযুক্তি ভারতে রপ্তানির পথ খুলে দিতে পারে। আলোচনায় রয়েছে ১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার লেজারভিত্তিক অস্ত্র ব্যবস্থা ‘আয়রন বিম’ এবং ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির যৌথ উৎপাদন।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খান বলেন, এটি একটি বিশেষ কৌশলগত চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত। তার মতে, গত বছর পাকিস্তান-সৌদি চুক্তির পাল্টা ভারসাম্য হিসেবেও এটি দেখা যেতে পারে।

চীনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ বলেন, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান চার দিনের বিমানযুদ্ধের সময় ইসরায়েলি ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তার ভাষায়, প্রতিরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, সাইবার ও এআই খাতে সম্পর্ক আরও গভীর হতে যাচ্ছে।

এ সম্পর্ক আবার একমুখীও নয়। ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধে ভারতীয় অস্ত্র কোম্পানিগুলো ইসরায়েলকে রকেট ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসে। রিয়াদভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টারের গবেষক উমর করিমের মতে, দুই দেশই আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে থাকায় পারস্পরিক কৌশলগত নির্ভরতা আরও বেড়েছে।

নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত জোট কাঠামো এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ২০২৪-২৫ সালে সামরিক অভিযান চালানোর পর ইসরায়েল মনে করছে তারা শিয়া অক্ষ দুর্বল করেছে। উদীয়মান সুন্নি অক্ষ বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা এ প্রসঙ্গে বিবেচনায় থাকতে পারে। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ, যা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সংবেদনশীল ইস্যু।

উমর করিমের মতে, পাকিস্তান এই আলোচনায় পরোক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত। ফলে ইসরায়েল দিল্লির সঙ্গে গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে পারে। তবে আঙ্কারাভিত্তিক গবেষক গোকহান এরেলির মতে, পাকিস্তান সরাসরি লক্ষ্যবস্তু নয়; বরং ভারত-ইসরায়েল-পশ্চিমা বয়ানের সমন্বয়ের ফলে পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

মাসুদ খানও সরাসরি হুমকি দেখেন না, তবে কূটনৈতিক মনস্তত্ত্বে প্রভাবের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ শোয়াইবও বলেন, দিল্লির ঘনিষ্ঠতা তেল আবিবের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে জটিল ক্ষেত্র উপসাগরীয় অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা ও প্রবাসী আয় পাকিস্তানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির পর তুরস্ককে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের সঙ্গে কৌশলগত চুক্তি করেছে, যা আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

মাসুদ খালিদের মতে, জিসিসির বাইরে মধ্য এশিয়া, তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো জরুরি। বাণিজ্য ও সংযোগভিত্তিক ভূঅর্থনীতি আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হতে পারে। এদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থানও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। পাকিস্তান কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ভারত ও ইসরায়েল উভয়েই তাদের নিরাপত্তা নীতিতে ‘ইসলামি উগ্রবাদ’ মোকাবিলার কথা বলে। নয়াদিল্লি বারবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে সামরিক উত্তেজনার পর নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদর্শন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে ইসলামাবাদ কিছু কৌশলগত ভারসাম্য গড়ে তুলেছে।

Tags: ইসরায়েল মোদি