ব্রাজিল ফুটবলে নেইমার মানেই এক অনন্য আবেগ, এক চিরন্তন প্রত্যাশা। চোট কাটিয়ে প্রিয় তারকা কবে হলুদ জার্সি গায়ে মাঠে ফিরবেন, তা নিয়ে ভক্তদের উত্তেজনার শেষ নেই। তবে সমর্থকদের সেই আবেগের জোয়ারে গা ভাসাতে নারাজ সেলেসাওদের নতুন মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি। ২০২৬ বিশ্বকাপের রণকৌশল সাজাতে ব্যস্ত এই ইতালিয়ান কোচের পরিকল্পনায় আপাতত জায়গা হচ্ছে না নেইমারের। আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ছেন এই পোস্টার বয়।
মার্চ উইন্ডো: প্রতিপক্ষ যখন ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগামী মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে দুটি হাই-ভোল্টেজ প্রীতি ম্যাচ খেলবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বোস্টন ও অরল্যান্ডোতে অনুষ্ঠিতব্য এই ম্যাচ দুটিতে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ গত দুই বিশ্বকাপের রানার্সআপ ফ্রান্স এবং শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়া। আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল দলের জন্য এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি 'টেস্ট কেস' (Test Case) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেইমারকে ছাড়াই মাঠে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির কোচিং স্টাফ।
শারীরিক সক্ষমতা বনাম তারকা খ্যাতি ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম ও ইএসপিএন (ESPN)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাম্পিওনাতো পউলিস্তা থেকে নেইমারের পুরোনো ক্লাব সান্তোসের বিদায়ের পর তাঁর জাতীয় দলে ফেরার গুঞ্জন তীব্র হয়েছিল। কিন্তু আনচেলত্তি ও তাঁর সহযোগীরা শুরু থেকেই এই মার্চ উইন্ডোর (March Window) জন্য নেইমারকে বিবেচনায় রাখেননি। দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে ফেব্রুয়ারিতে মাঠে ফিরলেও নেইমার এখনও তাঁর চিরচেনা ছন্দে ফেরেননি।
আনচেলত্তির দর্শন স্পষ্ট—খ্যাতি বা নাম নয়, জাতীয় দলে ডাক পেতে হলে শতভাগ 'ম্যাচ ফিটনেস' (Match Fitness) থাকতে হবে। দীর্ঘ বিরতির পর ফেরা একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি নন তিনি। সিবিএফ (CBF) বা ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন নেইমারের শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও, সবুজ সংকেত দেওয়ার আগে তাঁর ক্লাব ফুটবলে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা দেখতে চায়।
২০২৬ বিশ্বকাপের রোডম্যাপ ও নেইমারের ভবিষ্যৎ ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২—টানা তিনটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের ভার সামলেছেন নেইমার। ২০২৬ আসরটি হতে পারে তাঁর ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ। তবে মে মাসে অনুষ্ঠেয় চূড়ান্ত মূল্যায়নের আগে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না তাঁর ভাগ্য। আনচেলত্তির 'ট্যাকটিক্যাল ব্লুপ্রিন্ট' (Tactical Blueprint)-এ নেইমার কীভাবে মানিয়ে নেবেন, তা নিয়ে সংশয় না থাকলেও তাঁর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আধুনিক ফুটবলের উচ্চ গতি এবং 'হাই-প্রেসিং' (High-pressing) গেমের সঙ্গে নেইমার কতটা পাল্লা দিতে পারবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে সেলেসাও জার্সিতে তাঁর ভবিষ্যৎ।
ভারসাম্য ফেরানোর লড়াই: আনচেলত্তির নতুন পরীক্ষা নেইমারকে বাইরে রেখে আনচেলত্তি এখন বেশি মনোযোগী দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বা 'Squad Balance' তৈরিতে। বিশেষ করে রক্ষণের দুই প্রান্ত অর্থাৎ 'ফুলব্যাক' (Fullback) পজিশন নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না তাঁর। সেন্টারব্যাকে মারকুইনোস ও গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালহায়েসের যোগ্য বিকল্প খুঁজে বের করা, মাঝমাঠের প্রাণভোমরা ব্রুনো গিমারেসের ব্যাকআপ নিশ্চিত করা এবং আক্রমণভাগের চূড়ান্ত কাঠামো দাঁড় করানোই এখন কোচের মূল লক্ষ্য।
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নেইমার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে পারেন, কিন্তু আনচেলত্তির যুগে 'নাম' নয় বরং 'পারফরম্যান্স' ও 'ফিজিক্যাল কন্ডিশন' (Physical Condition) দিয়েই যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। মার্চের এই প্রীতি ম্যাচগুলোই বলে দেবে, নেইমারহীন ব্রাজিল কতটা শক্তিশালী বা তাঁর অভাব কতটা প্রকট।