বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই বড়সড় এক চমক নিয়ে এলেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, ইউরোপীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'এয়ারবাস' (Airbus) থেকে ১২০টি বাণিজ্যিক বিমান কিনবে চীন। চ্যান্সেলর হিসেবে ম্যার্ৎসের প্রথম বেইজিং সফরে এই মেগা চুক্তিটি কেবল একটি ব্যবসায়িক লেনদেন নয়, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক মেরুকরণের এক অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক কূটনীতি ও এয়ারবাস চুক্তি বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বেইজিংয়ের দিয়াওউতাই রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন জার্মান চ্যান্সেলর। বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ম্যার্ৎস অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানান, চীন ১২০টি এয়ারবাস বিমান কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, "চীনের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে কতটা ইতিবাচক ফলাফল অর্জন সম্ভব। এটি জার্মানি তথা গোটা ইউরোপের অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রির (Aerospace Industry) জন্য বড় সুসংবাদ।" এছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চুক্তি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর ও ইউরো-চীন সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য শুল্ক নীতি (Tariff Policy) এবং অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বার্লিন ও বেইজিং নিজেদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব (Strategic Partnership) আরও মজবুত করতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন কঠোর সংরক্ষণবাদিতার দিকে এগোচ্ছে, তখন চীন ও জার্মানি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী। উল্লেখ্য, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে চীন জার্মানির প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার (Trading Partner) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পেশাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কৌশলগত সংলাপ অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়লেও জার্মানি এখনও চীনকে একটি 'সিস্টেমিক রাইভাল' (Systemic Rival) বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ম্যার্ৎস স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার দুয়ার খোলা রাখা প্রয়োজন। করোনা মহামারি এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে বন্ধ থাকা সরকারি পর্যায়ের নিয়মিত বৈঠকগুলো দ্রুত শুরু করার বিষয়েও ঐকমত্য পোষণ করেছেন দুই নেতা। শি জিনপিং তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্ককে 'নতুন উচ্চতায়' নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইউক্রেন ইস্যু ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বৈঠকে কেবল বাণিজ্য নয়, গুরুত্ব পেয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুও। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, শি জিনপিং সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি শান্তির ভিত্তি গড়তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমান অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। অন্যদিকে, ম্যার্ৎস বৈশ্বিক নিরাপত্তায় চীনের প্রভাব ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
পশ্চিমা নেতাদের বেইজিং দৌড় ম্যার্ৎসের এই সফর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও বেইজিং সফর করেছেন। পশ্চিমাদের এই বেইজিং অভিমুখী যাত্রা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় চীনের বিশাল বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব উপেক্ষা করা অসম্ভব।
১২০টি এয়ারবাস কেনার এই চুক্তিটি কেবল বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান এভিয়েশন (Aviation) চাহিদাই পূরণ করবে না, বরং ইউরোপীয় প্রযুক্তির প্রতি চীনের আস্থাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করল। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন এই নতুন ইউরো-চীন সমীকরণকে কীভাবে গ্রহণ করে।