পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) উত্তাপ বাড়িয়ে এবার সরাসরি তাইওয়ানের দোরগোড়ায় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা দিল জাপান। দেশটির পশ্চিমতম প্রান্তের ইয়োনাগুনি দ্বীপে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি। টোকিওর এই সাহসী পদক্ষেপ বেইজিংয়ের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
২০৩১ সালের লক্ষ্যমাত্রা: আকাশসীমা সুরক্ষায় কড়া পাহারা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে বিমান ও 'ব্যালিস্টিক মিসাইল' (Ballistic Missile) ভূপাতিত করতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ২০৩১ সালের মার্চের মধ্যে ইয়োনাগুনি দ্বীপে মোতায়েন করা হবে। কোইজুমি বলেন, “অবকাঠামো প্রস্তুতির অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে আমরা ২০৩০ অর্থবছরকে লক্ষ্য রেখে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি।” মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রুখতেই জাপান তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।
কৌশলগত অবস্থান: কেন ইয়োনাগুনি গুরুত্বপূর্ণ? জাপানের ইয়োনাগুনি দ্বীপটি ভৌগোলিকভাবে তাইওয়ান থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ভৌগোলিক ও সামরিক—উভয় দিক থেকেই এই দ্বীপের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১৫ সাল থেকেই সেখানে জাপানি 'সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্সেস' (SDF)-এর একটি ঘাঁটি রয়েছে। বর্তমানে সেখানকার রাডার কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬০ জন সদস্য সার্বক্ষণিকভাবে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হলে এই অঞ্চলটি জাপানের জন্য একটি শক্তিশালী সামরিক দুর্গে পরিণত হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ও জাপানের নীতিতে আমূল পরিবর্তন তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির কঠোর অবস্থান বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করেছে। গত নভেম্বর মাসে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক মাসের মাথায় তাকাইচি ঘোষণা করেছিলেন, যদি চীন তাইওয়ানে হামলা চালায় এবং তা জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে জাপানি এসডিএফ সরাসরি সেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। জাপানের দীর্ঘদিনের শান্তিবাদী পররাষ্ট্রনীতিতে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
বেইজিংয়ের পাল্টা তোপ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ তাকাইচির এই মন্তব্যের পর থেকেই টোকিও ও বেইজিংয়ের মধ্যে এক ধরণের 'ডিপ্লোম্যাটিক ডেডলক' (Diplomatic Deadlock) তৈরি হয়েছে। চীন সরকার তাকাইচিকে তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান। এর প্রতিশোধ হিসেবে চীন তাদের নাগরিকদের জাপান ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে এবং কয়েকটি জাপানি কোম্পানির ওপর রফতানি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বেইজিংয়ের অভিযোগ, জাপান পুনরায় ‘সামরিকীকরণ’ (Remilitarization)-এর পথে হাঁটছে, যা এশীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
স্থানীয় জনমত ও সরকারের চ্যালেঞ্জ প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোইজুমি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে দ্বীপটির প্রায় ১ হাজার ৫০০ বাসিন্দার কাছে সরকারের এই বিশদ পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করা হবে। যদিও আগে থেকেই সেখানে এসডিএফ-এর ঘাঁটি রয়েছে, তবে বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করা এবং একই সঙ্গে চীনের সামরিক উস্কানি মোকাবিলায় নিজেদের প্রতিরক্ষা দেয়াল সুসংহত রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের একচেটিয়া আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। এখন দেখার বিষয়, জাপানের এই ‘ডিফেন্সিভ ঢাল’ বেইজিংকে শান্ত করে নাকি সংঘাতের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।