বিগত নির্বাচনের ফলাফল এবং জনমতের ব্যবধান নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভালোবাসা ও স্বতঃস্ফূর্ত ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেনি; বরং নানা ‘কায়দা’ ও নির্বাচনী ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ (Election Engineering) এর মাধ্যমে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়েছে তারা।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মিরপুরে মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও জনমতের ব্যবধান নির্বাচনী পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এ দেশের মানুষ অনেক আদর্শ ও পালাবদল দেখেছে। এবারের নির্বাচনে বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে একটি বড় পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল। আমাদের সংস্কার ও পরিবর্তনের ডাকের পক্ষে ৬৯ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে, যা পরিবর্তনের অকাঙ্ক্ষিত প্রমাণ।”
তিনি বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, তারা মূলত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অর্থাৎ ‘না’ ভোটের পক্ষে ছিলেন। ভোটের প্রকৃত হিসেবে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন না।
ভোটের কারচুপি ও ‘অন্ধকার’ কৌশল নির্বাচনী অনিয়মের বর্ণনা দিতে গিয়ে জামায়াত আমির অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি অভিযোগ করেন, “নির্বাচনের দিন অনেক জায়গায় হঠাৎ ‘ইলেকট্রিসিটি’ (Electricity) বন্ধ করে দিয়ে ফলাফল নয়ছয় করা হয়েছে। দেশের বহু জায়গায় আমাদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কর্মীরা রক্তের বিনিময়ে ভোট চায়নি বলে তারা কেন্দ্র ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা এই নোংরা কৌশলগুলো এবার চিনে নিয়েছি।” ভবিষ্যতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ‘শক্ত পাহারা’ দেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সংসদে যোগদানের যৌক্তিকতা অল্পসংখ্যক আসনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও কেন জামায়াত সংসদে যোগ দিল—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণের দেওয়া ভোটের যেটুকু মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হয়েছে, আমরা তার অমর্যাদা করতে পারি না। সংসদে আমাদের আসন সংখ্যা কম হতে পারে, কিন্তু আমরা সেখানে নিজেদের স্বার্থে নয়, বরং ‘পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন’ (Public Representation) নিশ্চিত করতে এবং মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কথা বলব।”
সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের সাধুবাদ বিরোধী অবস্থানে থাকলেও সরকারের কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “এমপি-মন্ত্রীদের সরকারি প্লট না নেওয়া এবং ‘ট্যাক্স ফ্রি’ (Tax-free) গাড়ি ব্যবহার না করার দাবি আমরাই প্রথম তুলেছিলাম। সরকার আমাদের সেই প্রস্তাব অনুসরণ করায় তাদের অভিনন্দন জানাই। একইসঙ্গে প্রবাসে মৃত ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’দের (Remittance Fighters) লাশ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার সিদ্ধান্তকেও আমরা সাধুবাদ জানাই।”
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি মিরপুর-কাফরুল (ঢাকা-১৫) এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “রমজানে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না। যারা চাঁদার অত্যাচারে অতিষ্ঠ, তারা আজ থেকে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করুন। কেউ যদি বাধা দেয় বা ভয় দেখায়, আমাদের খবর দেবেন। আমরা সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।”
জনগণের মুখোমুখি হওয়ার অঙ্গীকার নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান এক ব্যতিক্রমী ঘোষণা দেন। তিনি জানান, দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে তিনি মাসে অন্তত একদিন সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হবেন এবং তাদের গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শ শুনবেন। একে তিনি প্রকৃত ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ (Public Accountability) হিসেবে অভিহিত করেন।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।