পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান বলেছে, হামলা হলে জোরালো জবাব দেওয়া হবে। এমন প্রেক্ষাপটে আলোচনাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) তিন ঘণ্টা আলোচনা শেষে বৈঠক স্থগিত করা হয়। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। তিনি জানান, আলোচকরা ‘সৃজনশীল ও ইতিবাচক ধারণা’ বিনিময় করেছেন এবং বিরতির পর আবারও বসবেন। আমরা আরও অগ্রগতির আশা করছি।
তবে চুক্তির সম্ভাবনা কতটা, তা এখনও অনিশ্চিত। আগের দুই দফার মতো এবারও ইরান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি; যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
জেনেভার আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম গঠন, ইরানের প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং যাচাই-বাছাই ও তদারকি ব্যবস্থার বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিনিময়ে ইরান অর্থনীতিকে চাপে ফেলা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায়।
বিরোধীরা বলছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে শাসকগোষ্ঠী নতুন জীবনরেখা পাবে। তবে ট্রাম্প কোন শর্তে রাজি হবেন, তা স্পষ্ট নয়। ইরান ইতোমধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমা আরোপ ও আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান এ জোটকে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বলে অভিহিত করে; যার মধ্যে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে মিলিশিয়া ও ইয়েমেনে হুতিরা রয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমে প্রশাসনের কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শিগগিরই ইরানের বিপ্লবী গার্ড বা পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত হামলার কথা ভাবছেন।
আলোচনা ভেস্তে গেলে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে বড় ধরনের অভিযানের নির্দেশও দিতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান হামলার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন বলেও জানা গেছে। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, জেনারেল ড্যান কেইন মনে করেন এটি ‘সহজেই জেতা যাবে’।
ইরান বলেছে, হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানা হবে।
একদিকে কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও অন্যদিকে সীমিত হামলার বিকল্পও বিবেচনায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প, যাতে তেহরানকে চুক্তিতে রাজি করানো যায়। তবে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী চাইছে এবং কেন এখন সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি তিনি। বিশেষ করে গত বছরের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর আট মাস পর।
ইরান নিজেদের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
গত মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনকে কেন্দ্র করে প্রথমবার ইরানে বোমা হামলার হুমকি দেন ট্রাম্প। পরে তার মনোযোগ ঘুরে যায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে, যা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার সেনা ও দুটি বিমানবাহী রণতরিসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ অঞ্চলটিতে মোতায়েন করেছে। ট্রাম্প একে ‘আর্মাডা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। ইরান বরাবরই দাবি করে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। যদিও পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরানই প্রায় অস্ত্রমানের কাছাকাছি পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।
কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। বিস্তারিত উল্লেখ না করলেও তিনি অভিযোগ করেন, গত বছরের হামলার পর ইরান আবারও পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করার চেষ্টা করছে। বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাস পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া যায় না।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, সেগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। তারা চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমরা সেই গোপন শব্দগুলো শুনিনি আমরা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র রাখব না।
ইরান বলছে, হামলার পর সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোয় আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি তেহরান।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক মাধ্যমে আরাঘচি লেখেন, ইরান কোনো অবস্থাতেই কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। পারস্পরিক উদ্বেগ দূর করে উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে ‘বড় মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কোনো চুক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন, যাতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক মিত্রদের প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। চলতি মাসে হোয়াইট হাউস সফর করা নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থার পতনের লক্ষ্যেই সামরিক অভিযানের পক্ষে চাপ দিচ্ছেন তিনি।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ইসরায়েলের কাছেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও দেশটি এ বিষয়ে নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করে না।
কংগ্রেসে ভাষণের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের উভয় দলের শীর্ষ নেতা এবং গোয়েন্দা কমিটির সদস্যদের নিয়ে গঠিত তথাকথিত ‘গ্যাং অব এইটকে’ গোপন ব্রিফিং দেন।
ব্রিফিং শেষে সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বলেন, বিষয়টি গুরুতর। প্রশাসনকে আমেরিকান জনগণের কাছে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
সূত্র: বিবিসি