মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর ড্রোনের দখলে। ইসরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাতের আঁচ এবার গিয়ে পড়ল বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ কাতারের গায়ে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের দুটি ড্রোন দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প নগরী ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে (Energy Installations) আঘাত হেনেছে। এই হামলার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা: বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি কেন্দ্র কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের একটি ড্রোন মেসাইদ (Mesaieed) অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওয়াটার ট্যাংক বা জলের ট্যাঙ্ক লক্ষ্য করে হামলা চালায়। প্রায় একই সময়ে দ্বিতীয় ড্রোনটি আঘাত হানে 'কাতার এনার্জি'র (Qatar Energy) অধীনে থাকা রাস লাফান (Ras Laffan) শিল্প নগরীর একটি জ্বালানি স্থাপনায়। রাস লাফান হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (LNG) উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চল।
প্রাথমিক রিপোর্টে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও, জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে এ ধরনের ড্রোন স্ট্রাইক (Drone Strike) বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইনকে (Supply Chain) হুমকির মুখে ফেলেছে। হামলার ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বর্তমানে কারিগরি মূল্যায়ন চালাচ্ছে এবং শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সংঘাতের সূত্রপাত ও খামেনির মৃত্যু সংবাদে উত্তাল ইরান গত শনিবার থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভেতরে বড় ধরনের আকাশপথ অভিযান চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে (সূত্র অনুযায়ী)। এই অভাবনীয় ঘটনায় ইরানজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্যমতে, ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের পাল্টা জবাব ও আঞ্চলিক অস্থিরতা শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইরান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি (US Military Bases) এবং সরাসরি ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। কাতার মূলত বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন বিমান ঘাঁটিগুলোর একটির (আল-উদেইদ) আয়োজক দেশ হওয়ায়, ইরানি হামলা কাতার পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়াকে সামরিক বিশ্লেষকরা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। ইরানের এই পদক্ষেপকে তাদের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’-এর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা শঙ্কা কাতার এনার্জির স্থাপনায় এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও এলএনজির মূল্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পারস্য উপসাগরের ওপর দিয়ে জ্বালানি পরিবহন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি কাতার বা সৌদি আরবের মতো জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলোর স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট (Strategic Assets) বা কৌশলগত সম্পদগুলো এভাবে হামলার শিকার হতে থাকে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বর্তমানে কাতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।