মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মসলার গন্ধ শুঁকে শুঁকে বড় হওয়া মেয়েটি কখন যে নিজের স্বপ্নের রেসিপি গড়ে তুলেছিলেন, তা বুঝে উঠতে পারেননি কেউ। বিয়ের পর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব।
স্বামী মোর্শেদ আহমেদ একটি ডেভেলপার কোম্পানির ম্যানেজার, চাকরির ব্যস্ততা থাকলেও স্ত্রীর স্বপ্নে তিনি হয়েছেন সবচেয়ে বড় সহযাত্রী। একমাত্র কন্যা সন্তানের জন্মের আগেই সিঁথি নিয়মিত রান্না শুরু করেন। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা তার রান্নার প্রশংসা করতে থাকেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ছোট্ট উদ্যোগ ‘রসুই ঘর’।
আজ সেই রসুই ঘর জায়গা করে নিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার পুরান ঢাকার আইসিসিবি ইফতার বাজারে। ২৯-৩০ নম্বর স্টলে সাজানো তার হাতের তৈরি হরেক স্বাদের ইফতার। স্টলের সামনে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে ছানা জিলাপির সোনালি রং। সাধারণ জিলাপির চেয়ে একটু আলাদা—ভেতরে নরম ছানার টেক্সচার, বাইরে হালকা খাস্তা আবরণ।
সিঁথি বলেন, “ছানা জিলাপিটা আমাদের স্পেশাল। অনেকেই প্রথমে অবাক হন, পরে খেয়ে আবার নিতে আসেন।”
এ ছাড়া রয়েছে চিকেন পুলি, চিকেন স্ট্রিপ, চিকেন জালি, শাহী রোস্ট, কাবুলি পোলাও, দইবড়া, শাহী জর্দা, গোলাপ জাম। প্রতিটি পদই তার নিজের হাতে তৈরি। রান্নাঘরের অভিজ্ঞতা আর মায়ের কাছ থেকে শেখা কৌশল মিশিয়ে তিনি তৈরি করেন স্বাদে আলাদা এক পরিচিতি।
স্টলে বিক্রির দায়িত্বে আছেন স্বামী মোর্শেদ আহমেদ। হাতে প্যাকেট, সামনে ক্রেতার ভিড়। তবু মুখে হাসি। তিনি বলেন, “আমি চাকরি করি, কিন্তু বৌয়ের রান্নার স্বাদ যেন আরও অনেকের কাছে পৌঁছায়—এই ইচ্ছা থেকেই এখানে স্টল নেওয়া। বিক্রি ভালো হচ্ছে। মানুষ প্রশংসা করছে, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।” নিকুঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ শেখ নিয়মিত রসুই ঘর থেকে ইফতার কেনেন। তিনি বলেন, “প্রতিদিন ছেলে এসে ইফতার নিয়ে যায়। আমি মাঝে মাঝে নিজেও আসি। পুরান ঢাকার খাবারের স্বাদ পেতে আমাদের জন্য এটা অনেক বড় সুযোগ। এখানকার খাবারের স্বাদ মজাদার, আর ঘরোয়া একটা অনুভূতি আছে।”
বুধবার (৪ মার্চ) বিকেলে আইসিসিবি হেরিটেজ রেস্টুরেন্টের সামনে দেখা যায় ভোজনরসিক মানুষের ভিড়। কেউ হাতে কাবাবের প্যাকেট, কেউ জিলাপির বাক্স, কেউবা হালিমের ডাবল প্যাক নিয়ে ব্যস্ত। শিশুরা মিষ্টির স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে, বড়রা তালিকা মিলিয়ে কিনছেন ইফতার।
আইসিসিবি হেরিটেজ রেস্টুরেন্ট পাঁচটি স্টলজুড়ে সাজিয়েছে তাদের আয়োজন। রেশমি জিলাপি, মালাই জর্দা, টার্কিশ নান, হোল চিকেন বারবিকিউ, চিকেন তন্দুরি কাবাব, চিকেন হারিয়ালি কাবাব, বিফ শেখ কাবাব, বিফ হান্ডি কাবাব, বিফ কালো ভুনা—সব মিলিয়ে বিশাল আয়োজন।
হেরিটেজ রেস্টুরেন্টের বিক্রেতা শাহরিয়ার নাফিজ বলেন, “কাবাব আইটেমগুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। মালাই জর্দা, দই, কাচ্চি তেহারি, বিফ-মাটন হালিমও ভালো চলে। অনেকে অফিস শেষে সরাসরি এখানে চলে আসেন।”
হলরুমের পাশেই রান্নার ঘর। সেখানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বাবুর্চি মো. আবুল কালাম। পাঁচ বছর ধরে আইসিসিবিতে কর্মরত তিনি। কড়াইতে নেড়ে দিচ্ছেন মাংস, অন্যদিকে ওভেনে ঢুকছে কাবাব। তিনি বলেন, “এখানে লাইভ রান্না হয়। অর্ডার আসলে সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করে দিই। চার-পাঁচ পিস স্যাম্পল দিই। বিক্রি হয়ে গেলে আবার বানাই। তাজা গরম খাবার দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”
আইসিসিবির সার্ভিস সুপারভাইজার দেলোয়ার হোসাইন বাংলানিউজকে জানান, চিকেন রেশমি কাবাব তাদের অন্যতম জনপ্রিয় পদ। “গোপন মশলা, হোয়াইট কভার, ডানো ক্রিম আর বিশেষ পাউডার দিয়ে বানানো হয়। স্বাদে আলাদা বলেই মানুষ বারবার খোঁজ করেন,” বলেন তিনি।
আইসিসিবি ইফতার বাজারে ইফতার করতে এসছেন দম্পতি তানভীর ও নুসরাত। তানভীর বলেন, “শুধু কিনে নিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, এখানে বসে ইফতার করার আনন্দও আলাদা। পরিবেশটা উৎসবের মতো।” নুসরাত যোগ করেন, “বাড়ির বাইরে থেকেও যেন ঘরের স্বাদ পাওয়া যায়।”
ইফতার বাজার ঘুরে বোঝা যায়, এটি শুধু কেনাবেচার স্থান নয়, এখানে তৈরি হচ্ছে সম্পর্কের গল্প। একজন স্ত্রীর স্বপ্নে স্বামীর সহায়তা, বাবুর্চির দক্ষতা, বিক্রেতার আন্তরিকতা আর ক্রেতার সন্তুষ্টি—সব মিলিয়ে এক মানবিক আয়োজন।
সিঁথি দিনের শেষে ক্লান্ত চোখে স্টলের দিকে তাকিয়ে বলেন, “মানুষ যদি বলে ভালো লেগেছে, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য। রান্নাটা আমার ভালোবাসা।”
প্রসঙ্গত, প্রথম রোজা থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন চলবে ২৭ রমজান পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর দেড়টা থেকে আইসিসিবি ইফতার বাজারে ইফতারসামগ্রী বিক্রি শুরু হয়।