• ব্যবসায়
  • ‘আমি চাই কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করে ফেলুক’

‘আমি চাই কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করে ফেলুক’

ইআরএফের , প্রাক-বাজেট ,আলোচনায়, এনবিআর চেয়ারম্যান

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
‘আমি চাই কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করে ফেলুক’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো টাকা পাচারকারীদের ধরে তাদের কাছ থেকে পুরো টাকা নিয়ে যায়। কিন্তু আমি চাই, এই টাকা তারা কর দিয়ে সাদা করে ফেলুক।

তিনি বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিদ্যমান হারে কর দিয়ে আয়কর নথিতে দেখানো যায়। করদাতারা ৭টি সোর্স অব ইনকাম থেকে তাদের আয় দেখাতে পারেন।

বিবিধ খাতেও এই আয় দেখিয়ে তারা কালো টাকা সাদা করতে পারেন। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সদস্যদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

আবদুর রহমান খান বলেন, ‘অনেকেই জানতে চান, নানা কারণে যেভাবে হোক গত কয়েক বছরে অনেক টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এখন তারা সেই টাকা দেশে আনতে চান, আয়কর নথিতে সেই টাকা প্রদর্শন করতে চান।

এর জন্য আমরা (এনবিআর) আলাদা কোনো স্কিম দেবো কি না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমরা গত ৫৪-৫৫ বছর ধরে এ ধরনের অনেক স্কিম দিয়েছি, কিন্তু সেগুলো হিতে বিপরীত হয়েছে। কারণ এতে ভালো করদাতারা নিরুৎসাহিত হয়। তারা সারা বছর গুনে গুনে কর দিল, আর কর ফাঁকি দেওয়া লোকজন তিন ভাগের এক ভাগ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করবে এটা সৎ করদাতারা ভালো চোখে দেখেন না। ’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, বিদ্যমান করহার অনুযায়ী কর দিয়ে যে কেউ অপ্রদর্শিত অর্থ তার আয়কর নথিতে প্রদর্শন করতে পারেন। এতে আমরা বরং খুশিই হবো।’

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি দেখেছি আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যাদের বাইরে টাকা-পয়সা আছে, তাদের ধরে পুরো টাকা নিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমি চাই যে করদাতারা মার্জিনাল বা গড় যে ট্যাক্স আসে তা দিয়ে কালোটাকা সাদা করে ফেলুক। এই সুযোগ অবারিত।

রেগুলার রেটে যে কেউ তার অপ্রদর্শিত আয় আয়কর নথিতে দেখাতে পারে।’ প্রাক-বাজেট আলোচনায় মোটাদাগে ৩৭টি বাজেট সংক্রান্ত প্রস্তাব তুলে ধরে ইআরএফ। এতে নেতৃত্ব দেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা।

এসব প্রস্তাবনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা, ভ্যাটের একক হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ, ব্যক্তি করের সর্বোচ্চ হার ৩০-৩৫ শতাংশে সীমিত রাখা। ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ও মুনাফার কর হ্রাস বা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত প্রত্যাহারের সুপারিশ করে সংগঠনটি।

এসব প্রস্তাবনা পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, অতি ধনীদের করহার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। একই সঙ্গে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করহার বিদ্যমান ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা আছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে এই নতুন কর হার কার্যকর হতে পারে।

কোন পর্যায়ের ধনীদের ওপর এই কর কার্যকর হবে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সুপার রিচ গ্রুপ—যাদের বার্ষিক আয় ১ কোটি টাকা, দেড় কোটি টাকা কিংবা ৫ কোটি টাকার বেশি—এমন যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অতি ধনী গ্রুপের ওপর আমরা এই বর্ধিত কর হার চালু করতে পারি।’

ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইআরএফ দেশের রাজস্ব পরিস্থিতি, অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী কাজ করে আসছে। জাতীয় সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কর্মরত প্রায় ২৬০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এই সংগঠন অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনসাধারণকে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে কাজ করছে। ইআরএফ মনে করে, রাজস্ব ফাঁকি রোধ ও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এনবিআর ও ইআরএফের যৌথ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রস্তাবনায় বলা হয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কমাতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে অতিরিক্ত কর ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের ব্যাংক সুদের ওপর উৎসে কর্তিত কর ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা কর্তিত কর ফেরত দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর করহার সর্বোচ্চ ০.৫ শতাংশে সীমিত রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে ইআরএফ।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে পৃথক রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইআরএফ। একইসঙ্গে বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড করমুক্ত রাখা এবং বাজারমূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পদ কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

গণমাধ্যম শিল্পের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার ওপর করহার কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি এনবিআরের তিনটি বিভাগ—কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়করের জন্য পৃথক হেল্পলাইন চালু এবং বিনিয়োগকারী ও করদাতাদের সহায়তায় প্রতিটি বিভাগে ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, করদাতা সেবার মান উন্নয়নে জেলা ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক মিডিয়াম ট্যাক্সপেয়ার ইউনিট (এমটিইউ) গঠন করা যেতে পারে। একইসঙ্গে কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে রাজস্ব ক্ষতির প্রাক্কলন প্রকাশের সুপারিশ করা হয়েছে।

এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে আমদানি শুল্ক কাঠামো ধীরে ধীরে কমানোর পাশাপাশি অনিবাসীদের সেবার ওপর উৎসে করহার পুনর্বিবেচনারও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

ইআরএফ আরও সুপারিশ করেছে, করযোগ্য জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে জাতীয় জরিপ পরিচালনা এবং উপজেলা পর্যায়ে কর প্রশাসনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা। একইসঙ্গে গাড়ি ও বাড়ির মালিকদের আর্থিক লেনদেন নজরদারিতে ব্যাংক, ভূমি অফিস, সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ ও বিভিন্ন ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রিয়েলটাইম তথ্য বিনিময়ের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া এনবিআরের গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগ আধুনিকায়ন, কর প্রশাসনে ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস চালু, কর-ভ্যাট-কাস্টমস কার্যক্রম সহজ করতে টিআইএন ও বিআইএন একীভূত করে ইউনিক আইডি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সাংবাদিকদের মানোন্নয়নে এনবিআরের সঙ্গে একটি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড চালুর প্রস্তাব দেয় ইআরএফ। এনবিআর চেয়ারম্যান তাতে ইতিবাচক সাড়া দেন।

Tags: ‘আমি চাই কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করে ফেলুক’