• ব্যবসায়
  • ব্যাংকিং খাতে তারল্য প্লাবন সরকারের ৫ হাজার কোটি টাকার ‘মাস্টারস্ট্রোক’

ব্যাংকিং খাতে তারল্য প্লাবন সরকারের ৫ হাজার কোটি টাকার ‘মাস্টারস্ট্রোক’

আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৯১ দিন মেয়াদি বিশেষ নিলাম

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
ব্যাংকিং খাতে তারল্য প্লাবন সরকারের ৫ হাজার কোটি টাকার ‘মাস্টারস্ট্রোক’

এমবিএ বাবর

দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে অর্থ সরবরাহের অতিরিক্ত প্রাচুর্য, অন্যদিকে সরকারের উন্নয়নমূলক ব্যয়ের তাগিদ। এই দ্বৈত চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আজ ১ এপ্রিল একটি বিশেষ নিলামের আয়োজন করতে যাচ্ছে। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে বাজার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে সরকারের তহবিলে জমা দেওয়া হবে। এই উদ্যোগ শুধু সরকারি অর্থায়নের একটি সাধারণ পদক্ষেপ নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবস্থাপনার এক কৌশলী আয়োজন। এটি অর্থনীতির জন্য একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এই নিলামটি সাধারণ ট্রেজারি বিল নিলাম থেকে আলাদা। সাধারণত সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যু করে। কিন্তু এবারের নিলাম ‘বিশেষ’ কারণ এটি মূলত বাজারে জমে থাকা অতিরিক্ত তারল্য শোষণের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ৫,০০০ কোটি টাকা, মেয়াদ মাত্র ৯১ দিন এবং আয়োজক বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের বিল পরিশোধ, ভর্তুকি ও প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে অর্থের চাহিদা তুঙ্গে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর হাতে অলস পড়ে থাকা বিপুল অর্থকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ বা রিভার্স রেপো) ব্যবস্থায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রেখেছে। এই ব্যবস্থায় অর্থ মাত্র এক দিনের জন্য জমা রাখা যায়। ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার সেই অর্থ তিন মাসের জন্য নিশ্চিত করে নেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, পলিসি রেটের চেয়ে কম সুদে এই অর্থ সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে। এটি সরকারের জন্য বড় আর্থিক সুবিধা। ব্যাংকগুলোও এক দিনের পরিবর্তে তিন মাসের নিরাপদ বিনিয়োগ পাবে। ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ তিনটি। প্রথমত, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স আশাতীতভাবে বেড়েছে, যা সরাসরি ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের মন্দা। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের সতর্কতার কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কমেছে। তৃতীয়ত, ডলার সংকটের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ। বিলাসদ্রব্য ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় আমদানিকারকদের ঋণ চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ জমে গেছে। এই অর্থ যদি অলস পড়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলোকে আমানতকারীদের সুদ দিতে হয় কিন্তু বিনিয়োগ না করায় মুনাফা কমে যায়। সরকারের এই উদ্যোগ তাই ব্যাংকগুলোর জন্যও স্বস্তির নিশ্বাস।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজারে অতিরিক্ত তারল্য থাকলে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ে। ব্যাংকগুলো সস্তায় ঋণ দিলে অর্থ সরবরাহ বেড়ে পণ্যের দাম চড়ে যায়। এই বিশেষ নিলামের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ায় ‘মানি সাপ্লাই’ সংকুচিত হবে। এটিকে ‘টাইট মনিটারি পলিসি’র একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরোক্ষভাবে এটি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।

অনেকে এটিকে সরকারের ঋণের চাপ হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র স্পষ্ট করে বলেছে, এটি ঋণ সংকটের ইঙ্গিত নয়। বরং অর্থবছরের শেষ সময়ে সরকারের অর্থের প্রয়োজন মেটানোর একটি সাশ্রয়ী উপায়। জুন মাসের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে অনুদান ও ঋণের কিস্তি আসবে। সেই অর্থ দিয়ে সহজেই এই ৯১ দিনের ঋণ পরিশোধ করা যাবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ঋণের বোঝা তৈরি হবে না।

সরকারের জন্য লাভ হলো কম সুদে উন্নয়ন কাজের অর্থায়ন। ব্যাংকগুলোর জন্য লাভ হলো অলস অর্থের নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ। অর্থনীতির সামগ্রিক লাভ হলো তারল্য শোষণের মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তবে একটি ঝুঁকিও রয়েছে—বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রবাসী আয়ের এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা হলে ব্যাংকিং খাত আরও শক্তিশালী হবে।

Tags: সরকার কোটি টাকা হাজার তারল্য প্লাবন ব্যাংকিং খাত মাস্টারস্ট্রোক