দেশের বাজারে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা যেন থামছেই না। চলতি বছরের শুরু থেকেই এই মূল্যবান ধাতুর মূল্যে দেখা যাচ্ছে তীব্র ওঠানামা। কখনও লাফিয়ে বাড়ছে, আবার পরক্ষণেই কমছে। এই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) নতুন করে দাম নির্ধারণের মাধ্যমে চলতি বছর দাম সমন্বয়ে ‘হাফসেঞ্চুরি’ বা ৫০ বার পরিবর্তনের রেকর্ড গড়ল দেশের স্বর্ণের বাজার। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়েই এই ঘন ঘন পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
রেকর্ড দামে স্বর্ণের নতুন উচ্চতা
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (BAJUS) সবশেষ মঙ্গলবার যে নতুন মূল্য তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে স্বর্ণের দাম এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ২১৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকা। মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকেই এই নতুন মূল্য কার্যকর করা হয়েছে।
বছর ঘুরতেই সমন্বয়ের ‘হাফসেঞ্চুরি’
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের মাত্র তিন মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে স্বর্ণের দাম মোট ৫০ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এই ৫০ বারের মধ্যে ২৯ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ২১ বার কমানো হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে দাম সমন্বয়ের ঘটনা ঘটেছিল মাত্র ১৭ বার। এক বছরের ব্যবধানে এই বিপুলসংখ্যক সমন্বয় স্বর্ণের বাজারে চলমান তীব্র Volatility বা অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ।
কেন এই ঘন ঘন দরপতন ও উল্লম্ফন?
স্বর্ণের বাজারে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ববাজারের লেনদেন প্রক্রিয়াকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান জানিয়েছেন, এই অস্থিরতার পেছনে দেশীয় কোনো সিন্ডিকেট বা ব্যক্তির হাত নেই। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের Stock এবং কেনাবেচার ধরনের ওপর ভিত্তি করেই স্থানীয় দাম নির্ধারিত হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে বিশ্ববাজারে ফিজিক্যাল গোল্ড (Physical Gold) বা প্রকৃত স্বর্ণের চেয়েও পেপার ট্রেডিং (Paper Trading) বা কাগজে-কলমে লেনদেনের প্রবণতা অনেক বেশি। এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত স্বর্ণের মজুত ছাড়াই ডিজিটাল লেনদেন বাজারকে প্রভাবিত করছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।
পাচার রোধ ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা
ঘন ঘন দাম পরিবর্তনের পেছনে একটি কৌশলগত কারণও তুলে ধরেছে বাজুস। বাজুস সভাপতির মতে, দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম যদি বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেক কম থাকে, তবে স্বর্ণ বিদেশে পাচারের (Smuggling) একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। জাতীয় স্বার্থে এবং ব্যবসায়ীদের লোকসান এড়াতে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতি মুহূর্তের Market Value বা বাজারমূল্য অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মানুষ স্বর্ণকে একটি সেফ হ্যাভেন (Safe Haven) বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। ফলে এর চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি যোগানের টানাপোড়েনে দামও থাকছে ঊর্ধ্বমুখী। বাজুস সতর্ক করেছে যে, বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতা বজায় থাকলে বছরের বাকি সময়টাতে আরও কয়েক দফা দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।