মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন যুদ্ধের কালো মেঘে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই এক নাটকীয় মোড় নিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তির চেয়ে ‘কূটনীতি’ বা Diplomacy-কেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। সোমবার (৩০ মার্চ) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার এই বক্তব্য বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ‘ব্যাক-চ্যানেল’ আলোচনা
সাক্ষাৎকারে মার্কো রুবিও অত্যন্ত গোপনীয় এক তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্থতাকারীদের (Mediators) মাধ্যমে সরাসরি বার্তা আদান-প্রদান ও আলোচনা চলছে। যদিও যুদ্ধের মাঠে উত্তাপ কমেনি, কিন্তু পর্দার আড়ালে উভয় পক্ষই একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পথ খুঁজছে। রুবিও বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময় একটি টেকসই সমাধান এবং চূড়ান্ত চুক্তিতে (Final Deal) পৌঁছানোকেই অগ্রাধিকার দেন। আমরা আগেও কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম এবং এখনো সেই পথটিই উন্মুক্ত রাখতে চাই।"
প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও সম্পদ বণ্টনে অসন্তোষ
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তেহরান তার দেশের অমূল্য সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যয় না করে হিজবুল্লাহ, হামাস এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের মতো বিভিন্ন ‘প্রক্সি’ (Proxy) গোষ্ঠীর পেছনে ঢালছে। রুবিওর মতে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক কৌশল কেবল মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে না, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোকেও দীর্ঘমেয়াদী হুমকির মুখে ফেলছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান যদি তাদের এই যুদ্ধংদেহী নীতি থেকে সরে আসে, তবেই ফলপ্রসূ আলোচনার পথ আরও প্রশস্ত হবে।
নেতৃত্বের পরিবর্তন ও আগামীর দর্শন
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল ইরানের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে রুবিওর মন্তব্য। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে এমন একটি নেতৃত্ব দেখতে চায় যারা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক শান্তির পক্ষে কাজ করবে। রুবিও বলেন, "আমরা সব সময় এমন একটি পরিস্থিতিকে স্বাগত জানাব, যেখানে ভিন্ন কোনো ভবিষ্যৎ দর্শনের (Future Vision) অধিকারী ব্যক্তিরা ইরানের নেতৃত্বে আসবেন। যদি ইরানের অভ্যন্তরে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়, তবে ওয়াশিংটন অবশ্যই সেই সুযোগ লুফে নেবে।"
কৌশলী অবস্থান: হুমকি বনাম কূটনীতি
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তেল রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র ‘খার্গ দ্বীপ’ উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই চরম উত্তেজনার মধ্যেই রুবিওর মুখে কূটনীতির কথা মূলত ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ (Maximum Pressure) কৌশলেরই অংশ বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অর্থাৎ একদিকে সামরিক চাপের ভয় দেখানো, অন্যদিকে সংলাপের টেবিল প্রস্তুত রাখা—এই দ্বিমুখী নীতিতেই এগোতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কো রুবিওর এই সাক্ষাৎকার এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যের পুরো Geopolitics এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা এই গোপন সংলাপ শেষ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি বা ঐতিহাসিক চুক্তিতে রূপ নেয় কি না।