পশ্চিম এশিয়ায় চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবার এক নতুন ও স্পর্শকাতর মোড় নিল। ইরানের মাশহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন বাহিনীর হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে দেশটির একটি বেসামরিক বিমান। ইরান সরকারের দাবি অনুযায়ী, বিমানটি নয়াদিল্লি থেকে ১১ টন জরুরি মানবিক সাহায্য (Humanitarian Aid) সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই নজিরবিহীন হামলায় বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।
মাশহাদে নজিরবিহীন হামলা ও মানবিক মিশনের অবসান
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, হামলার শিকার হওয়া বিমানটি দেশটির অন্যতম প্রধান বেসরকারি বিমান পরিষেবা সংস্থা ‘মাহান এয়ার’ (Mahan Air)-এর মালিকানাধীন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানটির নয়াদিল্লি থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং খাদ্যসামগ্রী নিয়ে তেহরানে ফেরার কথা ছিল। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার এই হামলাকে সরাসরি ‘মানবিক মিশনের ওপর আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে একটি বেসামরিক ফ্লাইটকে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আইন লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথবাহিনী।
তেহরানের তীব্র প্রতিবাদ ও নিরাপত্তার ঝুঁকি
হামলার পরপরই এক বিবৃতিতে ইরানি প্রশাসন জানায়, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই ফ্লাইটের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক রীতিবিরুদ্ধ। এই ঘটনার ফলে পশ্চিম এশিয়ার আকাশসীমায় বাণিজ্যিক বা কমার্শিয়াল ফ্লাইট (Commercial Flight) পরিচালনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। মাশহাদ বিমানবন্দরে এই হামলার ফলে মাটির বুকেই বিমানটি ধ্বংস হয়ে যায়, যা উদ্ধার অভিযানকেও ব্যাহত করছে।
পুরনো স্মৃতি ও পাল্টাপাল্টি দাবির লড়াই
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ইরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রায় ১৬ থেকে ১৭টি বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী বিমান ধ্বংস হয়েছিল। সেই সময় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করেছিল, ওই উড়োজাহাজগুলো গোপনে নিয়ন্ত্রণ করত ইরানের অভিজাত বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (IRGC) এবং কুদস ফোর্স। তাদের অভিযোগ ছিল, বেসামরিক বিমানের আড়ালে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছিল।
তবে এবারের মাশহাদ বিমানবন্দরে হামলার পর বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। পশ্চিমা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রে (Satellite Imagery) দাবি করা হয়েছে, ধ্বংস হওয়া বিমানগুলো সাধারণ যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী বিমান ছিল। যদিও ইসরায়েল এখনো দাবি করছে, ‘এয়ার ইরান’ এবং ‘মাহান এয়ার’-এর মতো বিমান ব্যবহার করে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার কাছে ড্রোন ও অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে তেহরান।
ভারত-ইরান মৈত্রী ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
সংঘাতময় পরিস্থিতিতে গত ১৮ মার্চ প্রথম দেশ হিসেবে ইরানে মানবিক সাহায্য পাঠিয়েছিল ভারত। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে সেই ত্রাণকে ‘দুটি সভ্যতার ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার সেবারও ইরানি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মাধ্যমেই ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছিল। কিন্তু এবার মাশহাদ বিমানবন্দরে মাহান এয়ারের বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ায় ভারতের দেওয়া সাহায্য সংগ্রহ করা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেসামরিক বিমানে এই ধরনের আক্রমণ যুদ্ধের নিয়মাবলীতে নতুন বিতর্ক উসকে দেবে। একদিকে তেহরান একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব একে ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের অংশ’ হিসেবে দাবি করছে। এই সংঘাতের জেরে আগামী দিনগুলোতে ভারতের মতো দেশগুলোর ত্রাণ কার্যক্রমও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে।