ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের রেশ এবার আছড়ে পড়ল ইউরোপের রাজনীতিতে। দীর্ঘদিনের NATO মিত্র হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরল এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল স্পেন। সোমবার (৩০ মার্চ) দেশটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরানে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান বা কার্গো বিমান স্পেনের আকাশসীমা (Airspace) ব্যবহার করতে পারবে না। এমনকি স্প্যানিশ ভূখণ্ডে থাকা যৌথ সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও (Military Base) মার্কিনিদের প্রবেশাধিকার চরমভাবে সীমিত করা হয়েছে।
মাদ্রিদের কঠোর অবস্থান ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর ঘোষণা
সোমবার মাদ্রিদে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মার্গারিটা রবেলস এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কর্মকাণ্ড বা অপারেশনের জন্য আমরা আমাদের কোনো সামরিক ঘাঁটি কিংবা আকাশসীমা—কোনোটিই ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছি না।’’ আগে থেকেই স্পেনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে কিছু বিধিনিষেধ ছিল, তবে চলমান সংঘাতের ভয়াবহতা বিবেচনায় সেই কড়াকড়িকে এবার ‘জিরো টলারেন্স’ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই ও নীতিগত সিদ্ধান্ত
স্পেনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং কাজ করছে গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শন। দেশটির অর্থনীতি মন্ত্রী কার্লোস কুয়ের্পো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে তা একতরফা (Unilateral) এবং ‘আন্তর্জাতিক আইন’ (International Law) লঙ্ঘন করে করা হয়েছে। তাই এই যুদ্ধে কোনো ধরনের পরোক্ষ সমর্থন না দেওয়ার যে জাতীয় নীতি স্পেন গ্রহণ করেছে, আকাশসীমা বন্ধ করা তারই প্রতিফলন।
স্যানচেজ বনাম ট্রাম্প: উত্তপ্ত কূটনৈতিক রণক্ষেত্র
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো স্যানচেজ শুরু থেকেই এই যুদ্ধের কড়া সমালোচক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি মনে করেন, আলোচনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সামরিক শক্তির প্রয়োগ মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্যানচেজের এই ‘অ্যান্টি-ওয়ার’ অবস্থানের পাল্টা জবাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুদ্ধের সময়ে অসহযোগিতা করলে স্পেনের বিরুদ্ধে ‘ট্রেড রিট্যালিয়েশন’ (Trade Retaliation) বা কঠোর বাণিজ্যিক প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তবে ট্রাম্পের এই বাণিজ্যিক হুমকি স্প্যানিশ সরকারকে তাদের অবস্থান থেকে নড়াতে পারেনি।
মার্কিন বাহিনীর জন্য কৌশলগত সংকট
স্পেনের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মার্কিন সামরিক লজিস্টিকস (Military Logistics) এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য স্পেন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট। এখন মার্কিন বিমানগুলোকে দীর্ঘতর এবং ব্যয়বহুল বিকল্প পথ (Strategic Route) বেছে নিতে হবে। তবে মাদ্রিদ জানিয়েছে, মানবিক সাহায্য বা কোনো জরুরি ফ্লাইটের (Emergency Flight) ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে পারে, তবে তা অবশ্যই যুদ্ধের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের এই সিদ্ধান্ত পশ্চিম ইউরোপের অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স বা ইতালির মতো দেশগুলো যদি মাদ্রিদকে অনুসরণ করে, তবে ইরানে মার্কিন সামরিক অপারেশন পরিচালনা করা পেন্টাগনের জন্য অত্যন্ত দুরুহ হয়ে পড়বে। এক সময়ের সুসংহত পশ্চিমা জোটে এই ফাটল বর্তমান যুদ্ধকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।