মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত ‘৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন’ (82nd Airborne Division)-এর হাজার হাজার প্যারাট্রুপার। সোমবার (৩০ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া দুই মার্কিন কর্মকর্তার তথ্যে এই চাঞ্চল্যকর Deployment বা সেনা মোতায়েনের খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অভিজাত ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের উপস্থিতি
নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ (বর্তমানে ফোর্ট লিবার্টি) থেকে আসা এই চৌকস প্যারাট্রুপাররা মূলত মার্কিন সেনাবাহিনীর ‘র্যাপিড রেসপন্স ফোর্স’ হিসেবে পরিচিত। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সেনাদলের মধ্যে রয়েছে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সদর দপ্তরের সদস্য, রসদ সরবরাহকারী লজিস্টিকস টিম (Logistics Team) এবং একটি শক্তিশালী ব্রিগেড কমব্যাট টিম (Brigade Combat Team)। এর আগে সপ্তাহান্তেই প্রায় ২,৫০০ মেরিন সেনা ওই অঞ্চলে পৌঁছেছেন। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এখন বিশাল এক মার্কিন সমরশক্তি জমায়েত হচ্ছে।
লক্ষ্য যখন খাড়গ দ্বীপ: ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত?
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ প্যারাট্রুপার মোতায়েনের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট রণকৌশল থাকতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরমহলে আলোচনা চলছে ইরানের ‘খাড়গ দ্বীপ’ (Kharg Island) দখল নিয়ে। উল্লেখ্য, এই দ্বীপটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির (Oil Export) প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তেহরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই দ্বীপ দখলের অভিযানের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
কঠিন চ্যালেঞ্জ ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি
যদিও মার্কিন প্যারাট্রুপাররা যে কোনো সময় অভিযানের জন্য ‘হাই অ্যালার্ট’ (High Alert)-এ রয়েছে, তবে ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করা মোটেও সহজ হবে না। একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র (Missile) ও ড্রোন (Drone) প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এই অভিযানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। মার্কিন সেনাদের অবতরণের সময় তারা ইরানের শক্তিশালী ড্রোন স্কোয়াড্রনের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র বা তেল স্থাপনা ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ যে প্রচ্ছন্ন হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করতে গেলে উভয় পক্ষকেই বড় ধরনের প্রাণহানির মাশুল গুনতে হতে পারে।
ট্রাম্পের ‘ডিল অর ওয়ার’ নীতি
ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ (Maximum Pressure) নীতি অনুসরণ করে আসছে। প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বারবার বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, দ্রুত কোনো সম্মানজনক চুক্তিতে (Deal) না পৌঁছালে ইরানের স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোতে আঘাত করা হবে। এই বাড়তি সেনা মোতায়েন মূলত তেহরানের ওপর সামরিক চাপ সৃষ্টির একটি বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি ভূখণ্ডে সরাসরি আক্রমণ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো না হলেও, প্রয়োজনে কয়েক ঘণ্টার নোটিশে অপারেশন শুরু করার মতো প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে।
অস্থিতিশীল ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কেবল ইরান নয়, বরং গোটা অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে মার্কো রুবিও-র মতো নীতিনির্ধারকরা ‘যে কোনো উপায়ে’ শক্তি প্রদর্শনের কথা বলছেন। ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বর্তমানে এই প্যারাট্রুপারদের সুনির্দিষ্ট মোতায়েনস্থল নিরাপত্তার স্বার্থে গোপন রাখা হয়েছে। তবে পারস্য উপসাগরের রণসজ্জা বলে দিচ্ছে, কূটনৈতিক আলোচনার পথ রুদ্ধ হলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও একটি ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে।