ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উত্তপ্ত রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিল ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ইস্যুটি। এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে মৌলিক বেশ কিছু বিষয়ে সরকার পক্ষের সঙ্গে একমত হতে পারেনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে গণভোট (Referendum), মানবাধিকার কমিশন এবং বিচারবিভাগ পৃথকীকরণের মতো ১৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত ইস্যুতে জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (Note of Dissent) বা ভিন্নমত দেওয়া হয়েছে। দলটির দাবি, জনস্বার্থ রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর অবস্থান।
দলীয়করণের আশঙ্কা ও কমিশনের স্বাধীনতা
রোববার (২৯ মার্চ) সংসদের বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, বৈঠকে প্রায় ২২টি বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ থেকে ১৫টি মৌলিক বিষয়ে কোনো ঐক্যমতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
রফিকুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, “মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং গুম-খুন প্রতিরোধ কমিশনের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা আবারও আগের মতো ‘দলীয়করণের’ (Politicization) লাইনে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। ওনারা সংখ্যাধিক্যের জোরে কিছু জনস্বার্থবিরোধী বিষয় পাস করার চেষ্টা করছেন, যা আমরা মেনে নিতে পারি না।”
বিচারবিভাগ ও দুদক নিয়ে অনড় অবস্থান
বিচারবিভাগ পৃথকীকরণ এবং এর প্রশাসনিক স্বাধীনতা রক্ষা নিয়ে জামায়াত তাদের সংসদীয় অবস্থানে অনড় রয়েছে। রফিকুল ইসলাম খান উল্লেখ করেন, সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারপতি নিয়োগের জন্য সংস্কারকৃত ‘বাছাই কমিটি’ (Selection Committee) বহাল রাখার পক্ষে তারা জোরালো দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সরকার পক্ষ এসব সংস্কার রহিত করে পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাইছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক/ACC) এর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা খর্ব করার বিষয়েও জামায়াত তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। দলটির মতে, দুদকের ক্ষমতা কমানো মানেই দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়া।
গণভোট: সাংবিধানিক লড়াইয়ের নতুন কেন্দ্রবিন্দু
সংবিধানে গণভোটের (Referendum) বিধান রাখা না রাখা নিয়ে সৃষ্ট আইনি জটিলতা এখন রাজনৈতিক বিতর্কের তুঙ্গে। জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান স্পষ্ট জানান, গণভোটের সঙ্গে গোটা জাতির আকাঙ্ক্ষা জড়িত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ওনারা গণভোট বাতিল করার কথা বলছেন, যা আমরা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছি। যদি গণভোট সংবিধান বহির্ভূত হয়, তবে একই দিনে হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে বৈধ হয়? জনগণ ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করেছে, সুতরাং সেই রায় কার্যকর করাই গণতান্ত্রিক রীতি।”
চূড়ান্ত ফয়সালা হবে সংসদ অধিবেশনে
কমিটির বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে মাত্র গুটিকয়েক বিষয়ে কিছু সংশোধনীসহ একমত হওয়া গেছে। তবে মৌলিক যেসব বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে, সেগুলো চূড়ান্ত আলোচনার জন্য পুনরায় পূর্ণাঙ্গ সংসদ অধিবেশনে (Parliamentary Session) উত্থাপন করা হবে। জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, যেখানে জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে, সেখানে তারা সংসদীয় বিতর্কে কোনো ছাড় দেবেন না। অধিবেশনে এসব বিতর্কিত অধ্যাদেশ নিয়ে ভোটাভুটি বা দীর্ঘ বিতর্কের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানসহ দলের অন্যান্য সংসদ সদস্যরা উপস্থিত থেকে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই দাবিগুলো তুলে ধরেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ত্রয়োদশ সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল।