• ব্যবসায়
  • জ্বালানি তেলের ভয়াবহ ‘তেলেসমাতি’: খুপরি ঘর থেকে ভাঙারির দোকানে মিলছে অকটেন-ডিজেল

জ্বালানি তেলের ভয়াবহ ‘তেলেসমাতি’: খুপরি ঘর থেকে ভাঙারির দোকানে মিলছে অকটেন-ডিজেল

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
জ্বালানি তেলের ভয়াবহ ‘তেলেসমাতি’: খুপরি ঘর থেকে ভাঙারির দোকানে মিলছে অকটেন-ডিজেল

রাজধানীতে প্রকাশ্যে জ্বালানি তেলের কালোবাজারি; তদারকির অভাবে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।

দেশের জ্বালানি খাতে এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক চিত্র ফুটে উঠেছে। রাজধানীর অলিগলিতে এখন আর শুধু নিত্যপণ্য নয়, খুপরি ঘর থেকে শুরু করে ভাঙারির দোকানেও মিলছে অকটেন ও ডিজেল। পাম্পের বাইরে এমন অনিরাপদভাবে জ্বালানি তেল কেনাবেচা আইনত দণ্ডনীয় হলেও নজরদারির অভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই ‘ব্ল্যাক মার্কেটিং’ (Black Marketing)। বিশেষ করে রাজধানীর বসিলা, মোহাম্মদপুর এবং পার্শ্ববর্তী কেরানীগঞ্জ এলাকায় তেলের এই অবৈধ কারবার এখন ওপেন সিক্রেট।

রাজধানীর অলিগলিতে ‘বোটলড’ অকটেন: নজরদারির তোয়াক্কা নেই

সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, বসিলা এলাকায় কোনো রাখঢাক ছাড়াই খুপরি দোকানে বোতলজাত করে অকটেন বিক্রি করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি টের পেয়ে অনেক বিক্রেতা সটকে পড়লেও আড়ালে আবডালে চলছে লেনদেন। প্লাস্টিকের পানির বোতলে ভরে গ্যালন থেকে ঢেলে বিক্রি করা হচ্ছে এই দাহ্য পদার্থ, যা জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি।

একটি খুপরি দোকানে দেখা যায়, মুখে মাস্ক পরা এক ব্যক্তি বড় গ্যালন থেকে অত্যন্ত অপেশাদার পদ্ধতিতে লিটার মেপে বাইকারদের কাছে অকটেন সরবরাহ করছেন। কোথা থেকে এই তেল আসছে—এমন প্রশ্নে জনৈক বিক্রেতা জানান, তারা মূলত নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ডিপো থেকে ‘থার্ড পার্টি’ (Third Party) বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে প্রতিদিন তেল সংগ্রহ করেন। অভাবের তাড়নায় এই অবৈধ ব্যবসায় নামার অজুহাত দিলেও, এর পেছনে বড় কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কেরানীগঞ্জ ও বেড়িবাঁধ: ভাঙারির দোকানেও ডিজেলের রমরমা কারবার

জ্বালানি তেলের এই নৈরাজ্য কেবল বসিলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর-মিরপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন ভাঙারি বা স্ক্র্যাপের দোকানেও এখন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। কেরানীগঞ্জের জাউলাবাড়ি ও বামনশুরের মতো এলাকাগুলোতে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে অনেকটা প্রকাশ্যেই। ঘাটারচর এলাকায় দেখা গেছে, কাভার্ড ভ্যানে করে অবৈধভাবে ডিজেল সাপ্লাই দেওয়া হচ্ছে।

অনেকেই এই তেল মজুত বা ‘হোর্ডিং’ (Hoarding) করে রাখছেন অধিক মুনাফার আশায়। যেসব এলাকায় পাম্প দূরে বা সংকটের সময় হাহাকার তৈরি হয়, সেসব জায়গাই এই কালোবাজারিদের প্রধান টার্গেট। অনেক বিক্রেতা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত ডিজেল মজুত আছে এবং ক্রেতার প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো মূল্যে তা সরবরাহ করা সম্ভব।

নিয়ন্ত্রণহীন সাপ্লাই চেইন ও নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের খোলাবাজারে তেল বিক্রি প্রমাণ করে যে সরকার সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম. শামসুল আলম এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেন, “জাহাজ থেকে তেল খালাস হওয়া শুরু করে সাধারণ ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছানোর যে ‘সাপ্লাই চেইন’ (Supply Chain), সেখানে স্বচ্ছতা ও তদারকির অভাব রয়েছে। সরকার যদি এই প্রতিটি ধাপে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে এই কালোবাজারি বন্ধ হবে না। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এই অবৈধ বাজার মূলত জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনারই ফসল।”

আইনি ব্যবস্থা ও জননিরাপত্তা

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়া দাহ্য পদার্থ মজুত ও বিক্রির দায়ে কঠোর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পর্যাপ্ত না হওয়ায় অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এভাবে দাহ্য তেল মজুত রাখার ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জনস্বার্থে এই অবৈধ জ্বালানি বাণিজ্যের শেকড় উপড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি।

Tags: bangladesh news energy crisis supply chain dhaka news fuel blackmarket diesel octane illegal hoarding safety risk keraniganj update fuel monitoring