এ আইনটি ইসরায়েলের ইহুদি নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ফলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
অধিকাংশ মানবাধিকার সংস্থা ইতোমধ্যেই ইসরায়েলের এই সিস্টেমকে ‘আপার্থেইড’ বা বৈষম্যমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সেনেটে এ আইন অনুমোদন হওয়ার পর ‘রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য’ ইহুদি প্রধান অঞ্চলটির চরম-ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতারা মদ হাতে এটিকে উদযাপন করেন। উগ্র ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গাভির সেনেটেই মদ হাতে নতুন আইন অনুমোদনের ক্ষণ উদযাপন করেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সংসদে উপস্থিত থেকে আইনটির পাশ হওয়ায় আইনপ্রণেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান করায় ইসরায়েলিরা আনন্দিত হলেও তাদের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলো বিষয়টিতে খুশি হতে পারেনি। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং যুক্তরাজ্য এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, এই আইন প্রকৃতপক্ষে বৈষম্যমূলক এবং গোপন রূপে শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর অনুমোদন ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক নীতি মেনে চলার অঙ্গীকারকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এ আইনের বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
সংস্থাটি তখন বলেছিল, নতুন এ আইন মৃত্যুদণ্ডকে ‘ইসরায়েলের বৈষম্যমূলক আপার্থেইড ব্যবস্থার আরেকটি হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, আইনটি শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগ করা হবে। সংস্থাটির মিডল ইস্ট ডেপুটি পরিচালক অ্যাডাম কুগল বলেছেন, নিরাপত্তার জন্য আইন প্রয়োগের আড়ালে এটি বৈষম্যকে আরও মজবুত করে এবং দুই-স্তরের বিচার ব্যবস্থাকে গড়ে তোলে, যা আপার্থেইডের লক্ষণ।
আপার্থেইড কি? এটি এমন একটি রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেখানে কোনো একটি জাতি, বর্ণ বা গোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখা হয় এবং তাদের ওপর নিয়মতান্ত্রিকভাবে বৈষম্য চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থায় ক্ষমতা ও অধিকার একদল মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, আর অন্যদলকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় আইন, বিচার, শিক্ষা, বাসস্থান থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় (১৯৪৮–১৯৯৪) এই ব্যবস্থা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠী কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য আরোপ করেছিল।
বর্তমানে আপার্থেইড শব্দটি শুধু সেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, বরং যেকোনো এমন পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়- যেখানে একটি গোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে নিচু অবস্থানে রেখে বৈষম্যমূলক শাসন চালানো হয়।
আইনটি কীভাবে শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তু করছে? আইনটির মূল কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এটি প্রধানত সেই সামরিক আদালতগুলোয় প্রয়োগ হয়, যেগুলো দখলকৃত অঞ্চলে কেবল ফিলিস্তিনিদের বিচার করে। নতুন বিধান অনুযায়ী, দখলকৃত পশ্চিম তীরে কোনো ইসরায়েলি নাগরিক হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ফিলিস্তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
যদিও এসব আদালত নিয়মিতভাবে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। ২০১০ সালে তারা স্বীকার করেছিল যে পশ্চিম তীরে সংঘটিত অপরাধে বিচার হওয়া ফিলিস্তিনির মধ্যে ৯৯.৭৪ শতাংশই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, একই অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করলেও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বিচার হয় ইসরায়েলের বেসামরিক আদালতে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক সপ্তাহেই সাতজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকার মার্চের শেষের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি দশকের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি হত্যার অভিযোগে কোনো ইসরায়েলি নাগরিকের বিরুদ্ধে এখনো মামলা পর্যন্ত করা হয়নি।
নতুন আইনে বেসামরিক আদালতগুলো ইসরায়েলি নাগরিকদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয়তা পায়। বিচারকরা মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ রাখেন। বিপরীতে, সামরিক আদালতে বিচারাধীন ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড প্রায় স্বয়ংক্রিয়, আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার সুযোগ থাকে কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিনের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। একই সময়ে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ৯৩.৮ শতাংশ তদন্তই অভিযোগ গঠন ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে ইসরায়েলের ২০১৮ সালের নেশন-স্টেট আইন। অনেকের মতে, এই আইন রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন একটি কাঠামোকে বৈধতা দেয়, যা আপার্থেইড ধরনের শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। এতে ইসরায়েলকে একমাত্র ইহুদি জনগণের রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, এই আইনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের নাগরিকদের মর্যাদা কার্যত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সমতার কোনো স্পষ্ট সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এতে রাখা হয়নি।