নরসিংদীর মাধবদীতে চাঞ্চল্যকর কিশোরী হত্যার জট খুলেছে। দীর্ঘ তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, খোদ সৎ বাবাই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর। সামাজিক মর্যাদার দোহাই দিয়ে নিজ হাতে মেয়েকে ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন পাষণ্ড সৎ বাবা আশরাফ আলী। তবে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে আরও এক ভয়াবহ চিত্র—খুনের মাত্র কয়েকদিন আগে ওই কিশোরীকে গণধর্ষণের (Gang-rape) শিকার হতে হয়েছিল।
শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে নরসিংদীর পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল ফারুক এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন।
হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা ও স্বীকারোক্তি
পুলিশ জানায়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে মাধবদীর দড়িকান্দি এলাকার একটি নির্জন সরিষা খেত থেকে ওই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল, যা প্রাথমিকভাবেই শ্বাসরোধ করে হত্যার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ সৎ বাবা আশরাফ আলীকে (৪৫) জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনলে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে (Confessional Statement) আশরাফ আলী জানান, মেয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছিলেন। সেই ‘ক্ষোভ’ থেকেই তিনি হত্যার পরিকল্পনা করেন। ঘটনার রাতে মেয়েকে এক সহকর্মীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নির্জন স্থানে নিয়ে যান এবং সেখানেই ওড়না পেঁচিয়ে একাই তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
খুনের নেপথ্যে বীভৎস নির্যাতনের ইতিবৃত্ত
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, এই কিশোরী কেবল খুনের শিকারই হয়নি, বরং মৃত্যুর ১০-১২ দিন আগে সে চরম পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিল। গত ১০ ফেব্রুয়ারি জনৈক হযরত আলীর বাড়িতে ওই কিশোরীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পুলিশের তদন্তে এই ঘৃণ্য অপরাধে হযরত আলী, এবাদুল, জামান ও গাফফারের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
এছাড়া ওই কিশোরীর কথিত প্রেমিক নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরাও (২৮) বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ, একদিকে কথিত প্রেমিকের প্রতারণা এবং অন্যদিকে স্থানীয় বখাটেদের পাশবিক লালসার শিকার হয়ে মেয়েটি এক চরম মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে সৎ বাবার হাতে নৃশংস মৃত্যুতে।
মামলার অগ্রগতি ও গ্রেফতারের তালিকা
নিহত কিশোরীর মা ফাহিমা বেগম বাদী হয়ে মাধবদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। পুলিশি অভিযানে এখন পর্যন্ত প্রধান আসামি নুরা এবং ঘাতক সৎ বাবা আশরাফ আলীসহ মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন:
১. নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮) ২. এবাদুল্লাহ (৪০) ৩. হযরত আলী (৪০) ৪. গাফফার (৩৭) ৫. আহাম্মদ আলী মেম্বার (৬৫) ৬. মোঃ ইমরান দেওয়ান (৩২) ৭. মোঃ আইয়ুব (৩০) ৮. ইছাহাক ওরফে ইছা (৪০) ৯. মো. আশরাফ আলী (সৎ বাবা)।
বিচারের অপেক্ষায় এলাকা
পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সৎ বাবা আশরাফ আলী ছাড়াও নূর মোহাম্মদ নুরা এবং হযরত আলী বিজ্ঞ আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এই পৈশাচিক ঘটনার বিচার দ্রুততম সময়ে নিশ্চিত করতে পুলিশ 'Charge Sheet' বা অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে, নিজ ঘরেই এমন নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশে স্তম্ভিত স্থানীয় এলাকাবাসী দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।