ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বাকযুদ্ধ এখন সরাসরি ধ্বংসাত্মক সংঘাতের রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ ও ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ হুমকির জবাবে দমে না গিয়ে উল্টো পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নতুন তালিকা তৈরি করছে, যেখানে এর আগে কখনও হামলা চালানো হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বার্তা ও পেজেশকিয়ানের প্রত্যাখ্যান
উত্তেজনার সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার (৬ মার্চ), যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ (Truth Social)-এ একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে ইরানকে ‘Unconditional Surrender’ বা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি জানান। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইরান যদি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ না করে, তবে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা চুক্তি হবে না।
ট্রাম্পের এই কঠোর বার্তার পর শনিবার (৭ মার্চ) পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, কোনো ধরনের আগ্রাসনের মুখে ইরান কখনও মাথা নত করবে না এবং আত্মসমর্পণের প্রশ্নই ওঠে না। পেজেশকিয়ানের এই অনড় অবস্থানের পর ট্রাম্প আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তিনি হুমকি দেন যে, আজই ইরানে ‘কঠোর আঘাত’ হানা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানি ভূখণ্ডে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিত মৃত্যু’ (Total Destruction and Certain Death) নিশ্চিত করতে নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু বা ‘Target List’ পর্যালোচনা করছে।
ইরানের পাল্টা রণকৌশল: নতুন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ
ট্রাম্পের সরাসরি ধ্বংসাত্মক হুমকির পর ইরান তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। সিএনএন জানিয়েছে, ইরানের একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন প্রকাশ্যেই ইরানি জনগণকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন, তখন ইরানও চুপ করে বসে থাকবে না।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইরান এখন ওই অঞ্চলে থাকা আমেরিকান টেরিটরি (American Territory), মার্কিন বাহিনী এবং তাদের সহযোগী সংস্থাগুলোর ওপর নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে। বিশেষ করে যেসব মার্কিন ‘Military Base’ বা স্থাপনা এতদিন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মূল লক্ষ্যবস্তু তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না, সেগুলোকে এখন ‘Priority List’-এ আনা হচ্ছে। অর্থাৎ, ইরান এখন কেবল ইসরায়েল নয়, বরং সরাসরি মার্কিন স্বার্থের ওপর বড় ধরনের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সংঘাতের অষ্টম দিন: খাদের কিনারে মধ্যপ্রাচ্য
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোররাত থেকে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত আগ্রাসন শুরু হয়। আজ এই সংঘাত অষ্টম দিনে গড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ড্রোন (Drone) ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে ইরান।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা জোরদার করেছে। এতে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ইরানকে চাপে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী বা ‘Aircraft Carrier’ পাঠানোর বিষয়েও ওয়াশিংটন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ‘নিশ্চিত মৃত্যু’র মতো কঠোর ভাষা এবং ইরানের পাল্টা মার্কিন ঘাঁটি টার্গেট করার বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধ কেবল আকাশপথের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি বিশাল আঞ্চলিক যুদ্ধে (Regional War) রূপ নিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বর্তমানে তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই ‘Point of no return’ বা ফেরার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সম্ভাব্য মহাপ্রলয় ঠেকাতে পারে কি না।