• দেশজুড়ে
  • ড় ডিঙিয়ে বিশ্বমঞ্চে:- পাহাড়িকন্যা ঋতুপর্ণা চাকমা হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের ফুটবলের নক্ষত্র :- ঋতুপর্ণা চাকমা

ড় ডিঙিয়ে বিশ্বমঞ্চে:- পাহাড়িকন্যা ঋতুপর্ণা চাকমা হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের ফুটবলের নক্ষত্র :- ঋতুপর্ণা চাকমা

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
ড় ডিঙিয়ে বিশ্বমঞ্চে:- পাহাড়িকন্যা ঋতুপর্ণা চাকমা হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের ফুটবলের নক্ষত্র  :- ঋতুপর্ণা চাকমা

অসীম রায় (অশ্বিনী) বান্দরবান

২০২৬ সালের ৩ মার্চ। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের ম্যাচ খেলতে নেমেছে চীনের বিপক্ষে। ম্যাচের তখন ১৪ মিনিট। কাউন্টার অ্যাটাকে বল পায়ে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চলেছেন ঋতুপর্ণা চাকমা।

ঋতুপর্ণা চাকমা বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে এক নক্ষত্র হয়ে উঠেছেন। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়ি থেকে উঠে এসে তিনি বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হয়ে খেলছেন অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপে।

ঋতুপর্ণার সংগ্রামের গল্পটা জানা যায়, তার বাবা ব্রজবাসী চাকমা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান যখন ঋতুপর্ণা ছোট। মা ভুজপতি চাকমা পাঁচ সন্তানকে নিয়ে পড়েন এক অথৈ সাগরে। ঋতুপর্ণা ফুটবলের নেশায় মগ্ন হয়ে বিকেএসপিতে ভর্তি হন এবং বাঁ পায়ের অসাধারণ দক্ষতায় কোচদের নজর কাড়েন।

ঋতুপর্ণা চাকমা বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের হয়ে জিতেছেন একুশে পদক এবং বেগম রোকেয়া পদক। তিনি স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার।

আপনি কি সেই সময়ে ঋতুপর্ণা চাকমার মুখখানা খেয়াল করেছিলেন? বজ্র কঠিন মুখ; কিন্তু একই সঙ্গে চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত মায়া আর আশার ঝলক। এই মুখটা বড্ড চেনা। টিফিন ক্যারিয়ার হাতে সাত-সকালে গার্মেন্টসে ছুটতে থাকা অথবা প্রবল ভিড়ের মাঝে লোকাল বাসে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা দু’হাতে পাশাপাশি দুই চুলোয় চাপিয়ে দেওয়া তরকারি নাড়তে থাকা কোনো এক গৃহিণী– আপনার আশপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নারীর চেহারায় ঋতুপর্ণার সেই বজ্র কঠিন মুখায়বের প্রতিচ্ছবি। যেই মুখখানা নারীর প্রতিদিনের লড়াই-সংগ্রামের গল্প বলে। পাহাড় থেকে এসে ঋতুপর্ণা চাকমার এক অন্যরকম পাহাড় ডিঙানোর গল্প বলে।

ঋতুপর্ণা চাকমার সংগ্রামের গল্পটা জানতে আমাদের যেতে হবে রাঙামাটি শহর পেরিয়ে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়িতে। প্রধান সড়ক পেরিয়ে মেঠোপথ আর ধানি জমির আল ভেঙে হাঁটাপথে পাড়ি দিতে হবে আরও এক ঘণ্টার পথ। এখানেই ব্রজবাসী চাকমা ও ভুজপতি চাকমা দম্পতির বাস।

প্রথম তিন সন্তানই কন্যাসন্তান হওয়ায়, ব্রজবাসী ও ভুজপতি চাকমার আশা ছিল চতুর্থ সন্তান হিসেবে ছেলে জন্মাবে। সে আশা পূরণ হলো না। চতুর্থ সন্তান হিসেবে জন্ম নিল ফুটফুটে এককন্যা।

ব্রজবাসী চাকমার বোন নিলোবানু চাকমা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের বিশাল ভক্ত। তাই তিনি ভাইয়ের মেয়ের নাম রাখলেন ঋতুপর্ণা।

ব্রজবাসী চাকমার জমিজমা বিশেষ ছিল না। অল্প জমিতে চাষবাস করতেন যা দিয়ে সংসার চলত না। এরই মধ্যে এলো চরমতম দুঃসংবাদ—ব্রজবাসী চাকমার শরীরে ধরা পড়ে মরণব্যাধি ক্যান্সার। চিকিৎসার সামর্থ্যও ছিল না।

ঋতুপর্ণা চাকমার পর বংশের প্রথম ছেলে সন্তান হিসেবে জন্ম নেন পার্বণ চাকমা। চার মেয়ে ও এক ছেলে রেখে ২০১৫ সালে ক্যান্সারের কাছে হার মানেন ব্রজবাসী চাকমা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ হারানোর পর মা ভুজপতি চাকমা তাঁর পাঁচ সন্তানকে নিয়ে পড়েন এক অথৈ সাগরে।

ছোট্ট ঋতু তখন ফুটবলের নেশায় মগ্ন। মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম পরিচয় ঘটে ফুটবলের সঙ্গে। ছেলেদের সঙ্গে খেলতেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা তাঁর ফুটবল প্রতিভায় ছিলেন মুগ্ধ। তাঁর উৎসাহে ২০১৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে ট্রায়াল দিতে আসেন ঋতুপর্ণা।

বাঁ পায়ের অসাধারণ দক্ষতায় বিকেএসপির কোচদের নজর কাড়েন। ট্রায়ালে প্রথম হয়ে ভর্তি হন বিকেএসপিতে। ভর্তি ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা। সেই টাকাও জোগাড় করেন প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা।

ঋতুপর্ণার মেজ বোন চট্টগ্রামের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তাঁর বেতনের উপর চলে সংসার। বিকেএসপিতে ঋতুপর্ণার ৩-৪ মাসের বেতন বাকি থাকলেও, মেজ বোন কানের দুল বন্ধক রেখে জোগাড় করেন সেই টাকা।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ক্যাম্পে ডাক পান ঋতুপর্ণা চাকমা। বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে। এর পরের গল্পটা মোটামুটি সবার জানা—২০২২ ও ২০২৪ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়, ২০২৫ সালে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে জোড়া গোলের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মঞ্চে বাংলাদেশ।

২০২৩ সালে খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। খেলাধুলার পাশাপাশি নিজের অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের হয়ে জিতেছেন একুশে পদক। ক্রীড়া ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বেগম রোকেয়া পদক।

বর্তমানে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে খেলছেন অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপে। ঋতুপর্ণা স্বপ্ন দেখেন—বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার। পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ, বাধা-বিপত্তি আর চোখ-রাঙানি পেরিয়ে যে নারীরা এগিয়ে চলে, তাদের ঠেকানোর সাধ্য কার!