দেশের ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা ও একীভূতকরণের প্রভাবে সংকটে পড়া গ্রাহকরা এবার নিজেদের পাওনা আদায়ে কঠোর অবস্থানে গিয়েছেন। নবগঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর লেনদেন স্বাভাবিক করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী ‘হেয়ারকাট আইন’ প্রত্যাহারের দাবিতে বুধবার (১১ মার্চ) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন আমানতকারীরা। মুনাফাসহ শতভাগ আমানত ফেরতের নিশ্চয়তা না পেলে আগামী মাস থেকেই বড় ধরনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
তিন দফা দাবি ও আমানতকারীদের উদ্বেগ স্মারকলিপিতে আমানতকারীরা মূলত তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরেছেন। প্রথমত, আমানতকারীদের জমানো টাকার ওপর আরোপিত বিতর্কিত ‘Haircut’ (হেয়ারকাট) আইন অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী মুনাফাসহ আমানতের শতভাগ অর্থ ফেরত দিতে হবে। এবং তৃতীয়ত, একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর লেনদেন প্রক্রিয়া দ্রুত স্বাভাবিক করে গ্রাহকদের ভোগান্তি দূর করতে হবে।
আমানতকারীদের অভিযোগ, ‘হেয়ারকাট’ আইনটি পুরোপুরি ‘Shariah’ (শরিয়াহ) বিরোধী। তারা মনে করেন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের দোহাই দিয়ে গ্রাহকদের জমানো টাকার একটি অংশ কেটে নেওয়া বা আটকে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আল্টিমেটাম: ৭ এপ্রিল থেকে আন্দোলনের ডাক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পর উপস্থিত আমানতকারীরা গণমাধ্যমকে জানান, তারা পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই এই সংকটের একটি সুষ্ঠু সমাধান প্রত্যাশা করছেন। তারা আশা করেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন এবং গ্রাহকদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত পাওয়ার পথ সুগম করবেন। তবে দাবি পূরণ না হলে আগামী ৭ এপ্রিল থেকে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে একযোগে অবস্থান কর্মসূচি ও বড় ধরনের আন্দোলন শুরু করার ‘Ultimatum’ দিয়েছেন তারা।
এর আগে গত ৫ মার্চও মুনাফা হেয়ারকাট বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করেছিলেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কয়েকশ গ্রাহক।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ও একীভূতকরণের প্রেক্ষাপট উল্লেখ্য, গত বছরের ৩০ নভেম্বর সরকারের বিশেষ অনুমোদনে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ যাত্রা শুরু করে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত (Bank Merger) করে এই নতুন প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়েছিল। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো— ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL), এক্সিম ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক।
সঙ্কট নিরসনে সরকার এই ব্যাংকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ (Investment) করলেও সাধারণ গ্রাহকদের ‘Withdrawal’ বা টাকা তোলার ক্ষেত্রে এখনো নানাবিধ সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে ‘Haircut Law’-এর অধীনে গ্রাহকদের আমানতের কিছু অংশ সমন্বয় করার খবর ছড়িয়ে পড়লে আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অসন্তোষ দেখা দেয়।
ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিরতা নিরসনে আমানতকারীদের এই স্মারকলিপি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।