ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ আমলে নিয়ে নজিরবিহীন এক আদেশ দিয়েছেন দেশের উচ্চ আদালত। ঢাকা-১৩ আসনসহ মোট পাঁচটি সংসদীয় আসনের ব্যালট পেপার, রেজাল্ট শিট ও যাবতীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবং ‘Election Result’ চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫ আসনে ভোটের ফলাফলে আইনি চ্যালেঞ্জ বুধবার (১১ মার্চ) বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন। যে ৫টি আসনের ফলাফল ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো— ঢাকা-১৩, গাইবান্ধা-৫, ঢাকা-৫, পাবনা-৩ এবং কুষ্টিয়া-৪। আদালত এই আসনগুলোর নির্বাচনী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা আবেদনগুলো শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট আসনে বিজয়ী প্রার্থীসহ অন্যান্যদের প্রতি ‘Legal Notice’ ইস্যু করেছেন।
ঢাকা-১৩: ববি হাজ্জাজ বনাম মামুনুল হক ঢাকা-১৩ আসনের ভোটের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির ‘Heavyweight’ প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। তবে নির্বাচনের দিন থেকেই ‘Vote Rigging’ বা ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে আসছিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিস ও জামায়াত জোটের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হক। মামুনুল হকের দায়ের করা আবেদনের প্রেক্ষিতেই আদালত এই আসনের সব ব্যালট পেপার ও ‘Result Sheet’ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিশেষ হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের জয়ও চ্যালেঞ্জের মুখে কেবল ববি হাজ্জাজ নন, বিএনপির আরও চারজন প্রভাবশালী প্রার্থীর বিজয়ও এখন আদালতের স্ক্যানারের নিচে। তালিকায় রয়েছেন: ১. গাইবান্ধা-৫ আসনের ফারুক আলম সরকার। ২. ঢাকা-৫ আসনের নবী উল্লাহ নবী। ৩. পাবনা-৩ আসনের হাসান জাফির তুহিন। ৪. কুষ্টিয়া-৪ আসনের সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী। আদালত এই প্রতিটি আসনের আবেদন আমলে নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে কঠোরভাবে সরঞ্জাম সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে পরবর্তীতে ‘Re-counting’ বা পুনঃগণনার প্রয়োজন হলে কোনো তথ্যপ্রমাণ নষ্ট না হয়।
নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ও আইনি কাঠামো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা ‘Representation of the People Order (RPO)’ এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হলে তা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এই লক্ষে হাইকোর্ট একটি বিশেষ ‘Election Tribunal’ গঠন করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন বিচারপতি মো. জাকির হোসেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত বিএনপির ১৪ জন, ১১ দলীয় জোটের ৯ জন এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২৫ জনেরও বেশি প্রার্থী বিভিন্ন আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী? আদালতের এই আদেশের মাধ্যমে বিতর্কিত আসনগুলোর ভোট পুনর্মূল্যায়ন বা তদন্তের আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নোটিশের জবাব দাখিলের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এরপর আদালত পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করবেন। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাঝে আদালতের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ভোটারদের আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে এই আইনি লড়াই এখন দেশের নজর কাড়ছে।