বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি, ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা। একদিকে ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসি, অন্যদিকে তাঁরই উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার দুই প্রজন্মের এই মহাতারকার দ্বৈরথ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল ফুটবল দুনিয়া। কিন্তু ভক্তদের সেই প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হলো বহুল আলোচিত ‘ফিনালিসিমা’ (Finalissima)। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুই মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার অনমনীয় অবস্থানের কারণেই এই মহাযুদ্ধ মাঠের মুখ দেখছে না।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কাতার থেকে স্থানান্তর
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, চলতি মাসের ২৭ মার্চ কাতারের রাজধানী দোহায় মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল স্পেন ও আর্জেন্টিনার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা—তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। উয়েফা (UEFA) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কাতারের আয়োজক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর বর্তমান ‘Geopolitical Tension’-এর কারণে ম্যাচটি সেখানে আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভেন্যু নিয়ে রশি টানাটানি: কেন সফল হলো না আলোচনা?
কাতার থেকে ম্যাচটি সরিয়ে নেওয়ার পর উয়েফা ও কনমেবল (CONMEBOL) বিকল্প ভেন্যু নিয়ে আলোচনায় বসেছিল। তবে দুই পক্ষের ইগো ও স্বার্থের সংঘাতে কোনো সমাধান আসেনি। উয়েফার পক্ষ থেকে প্রথম প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল স্পেনের বিখ্যাত সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ম্যাচটি আয়োজন করার। সেখানে গ্যালারির আসন সংখ্যা দুই দেশের সমর্থকদের জন্য সমানভাবে ভাগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) তাতে সায় দেয়নি। স্পেনের মাটিতে স্পেনের বিপক্ষে খেলতে রাজি হয়নি বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
পরবর্তীতে ‘Home and Away’ ভিত্তিতে দুই লেগের ম্যাচের প্রস্তাবও আসে। যার একটি হওয়ার কথা ছিল মাদ্রিদে এবং অন্যটি ২০২৮ সালে বুয়েনস আইরেসে। কিন্তু সেই প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় আলবিসেলেস্তেরা। শেষ পর্যন্ত উয়েফা ইউরোপের কোনো ‘Neutral Venue’-তে ম্যাচটি আয়োজনের প্রস্তাব দিলেও আর্জেন্টিনা ৩১ মার্চ ছাড়া অন্য কোনো তারিখে খেলতে রাজি হয়নি। স্পেনের ঠাসা সূচির কারণে সেই তারিখটিও বাতিল হয়ে যায়।
মেসি বনাম ইয়ামাল: অপূর্ণ এক কাব্য
এই ম্যাচের মূল আকর্ষণ ছিল লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালের মুখোমুখি লড়াই। ১৮ বছর বয়সী ইয়ামালকে দেখা হচ্ছে মেসির সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে। দুজনেরই উঠে আসা বার্সেলোনার অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’ থেকে, দুজনেই বাঁ পায়ের জাদুকর এবং দুজনেই পরেন ১০ নম্বর জার্সি। ৩৮ বছর বয়সী মেসির গোধূলি বেলায় ১৮ বছরের ইয়ামালের সাথে এই ‘Tactical Battle’ দেখার জন্য যে গ্লোবাল অডিয়েন্স মুখিয়ে ছিল, ফিনালিসিমা বাতিল হওয়ায় তারা বড় ধরণের বঞ্চিত হলো।
ফিনালিসিমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের এই লড়াইয়ের এটি হওয়ার কথা ছিল চতুর্থ আসর। ১৯৮৫ সালে প্রথম আসরে ফ্রান্স উরুগুয়েকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এরপর ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনা হারায় ডেনমার্ককে। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালে লন্ডনের ওয়েম্বলিতে ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা জিতেছিল মেসিরা। এবার টানা দ্বিতীয়বার ট্রফি জয়ের সুযোগ থাকলেও মাঠের লড়াইয়ের আগেই সব শেষ হয়ে গেল।
ইউরোপিয়ান ফুটবলের ব্যস্ত সূচি এবং আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের সীমাবদ্ধতার কারণে নিকট ভবিষ্যতে এই ম্যাচটি আর আয়োজনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফুটবল প্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা, কারণ ক্লাব ফুটবলের বাইরে এমন এক ‘Elite Football’ দ্বৈরথ দেখার সুযোগ বারবার আসে না।