ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’। বৈশ্বিক তেলের বাজারের নাভি বলে পরিচিত এই প্রণালি এখন কার্যত একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই কৌশলগত জলপথটি সচল ও নিরাপদ রাখতে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জরুরি আহ্বান জানালেও, তাতে এখন পর্যন্ত মেলেনি আশানুরূপ কোনো সাড়া। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের আশঙ্কায় মিত্র দেশগুলোর এই ‘নীরবতা’ ওয়াশিংটনের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্পের ডাক ও মিত্রদের দ্বিধা নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ব্রিটেনকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, তাদের উচিত দ্রুত ওই এলাকায় নিজেদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানো। ট্রাম্পের দাবি, ইরান বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে, তাই হরমুজ প্রণালি আর বড় কোনো হুমকির কারণ হওয়া উচিত নয়। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মিত্র দেশগুলো এই মুহূর্তে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে নারাজ।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে চীনকে এই সংকট নিরসনে একটি গঠনমূলক অংশীদার বা Partner হিসেবে পাওয়ার প্রত্যাশা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বেইজিং বা টোকিও—কেউই এখন পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
অচল বিশ্ব বাণিজ্য: ১০০০ ট্যাংকার আটকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে প্রায় এক হাজার তেলের ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়ে আছে। এই অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক Supply Chain বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
তেহরান অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্ব তেলের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ছাড়া বাকি সবার জন্য উন্মুক্ত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, অনেক দেশই তাদের জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সরাসরি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
আলোচনা বনাম শক্তিপ্রদর্শন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিউ পেংইউ জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহ বা Energy Supply স্বাভাবিক রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে বেইজিং মনে করে, শক্তিপ্রদর্শনের চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো প্রয়োজন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও একই সুর প্রতিধ্বনিত করে জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পর ভারতের দুটি গ্যাস ট্যাংকার নিরাপদে ওই পথ পার হতে পেরেছে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা একটি আন্তর্জাতিক মিশনের (International Mission) মাধ্যমে জাহাজ পাহারার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে, তবে তা কেবল যুদ্ধ থামার পর। জার্মানি এই সামরিক পরিকল্পনার বিষয়ে শুরু থেকেই ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করেছে এবং সরাসরি এই যুদ্ধের অংশ হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
‘সাহস থাকলে জাহাজ পাঠান’: ইরানের চ্যালেঞ্জ ট্রাম্প যখন দাবি করছেন ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংসের পথে, তখন তেহরান থেকে আসছে পাল্টা হুঙ্কার। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, “ট্রাম্প যদি মনে করেন আমাদের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে সাহস থাকলে তিনি যেন নিজের জাহাজ পারস্য উপসাগরে পাঠান।”
নাইনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, যুদ্ধের প্রথম ১৬ দিনে ইরান যে ৭০০টি মিসাইল ছুড়েছে, তার সবগুলোই ছিল এক যুগ আগের পুরোনো প্রযুক্তি। তাদের মূল আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার এখনো অক্ষত এবং তা ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক মিশনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ, তেহরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় চীনের তেলের জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারছে। এই Geopolitics বা ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠনের পরিকল্পনাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।