দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে আগামীকাল রোববারের (১৫ মার্চ) মধ্যে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর অধিবেশন ডাকার আলটিমেটাম দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধিবেশন না ডাকলে কঠোর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এই জোট। আগামী ২৮ মার্চ বৈঠকের মাধ্যমে এই আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা (Roadmap) চূড়ান্ত করে রাজপথে নামার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
‘জুলাই সনদ’ ও জনগণের ম্যান্ডেট সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ (July Charter) অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জন্য ১৫ মার্চই সরকারের জন্য শেষ সময়। জোটের দাবি, এই সনদের ওপর ভিত্তি করেই প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার (Presidential Order) জারি করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে আয়োজিত গণভোটে (Referendum) দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ এর পক্ষে রায় দিয়েছিল।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জনগণ জাতীয় সংসদ গঠনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্যও ভোট দিয়েছে। একই দিনে ভোট ও গেজেট নোটিফিকেশন (Gazette Notification) হওয়ার পরও সরকার কেবল সংসদের অধিবেশন ডেকেছে, কিন্তু সংস্কার পরিষদের ব্যাপারে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। এটি সরাসরি জনগণের জনআকাঙ্ক্ষা ও ম্যান্ডেটের (Mandate) অবমাননা।”
নির্বাচন ও ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়ে প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ১১ দলীয় জোট। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যদিও এই নির্বাচনকে ‘ইতিহাসের সেরা’ বলা হচ্ছে এবং সহিংসতা কম হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে জনগণের ভোটাধিকারের প্রকৃত প্রতিফলন সেখানে ঘটেনি।
সরকারের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে জোটের সমন্বয়ক বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের (Interim Government) একজন উপদেষ্টাকে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়েছে যে, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ (Election Engineering)-এর পেছনে কারা জড়িত ছিল। ফলাফলের ক্ষেত্রে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। তারপরও বৃহত্তর স্বার্থে আমরা নির্বাচন মেনে নিয়েছি, কিন্তু সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।”
বিএনপি ও সরকারের ‘ইউটার্ন’ প্রসঙ্গে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রতি অনীহা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে জোটটি। হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, সংস্কারের জন্য ঐক্যমত কমিশন ও জুলাই সনদ তৈরি হওয়ার পর সরকার এখন ‘ইউটার্ন’ (U-turn) নিচ্ছে। সরকারের এই অবস্থানকে ‘জাতির সাথে প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ বা সদিচ্ছার অভাবই এই অচলাবস্থার মূল কারণ বলে মনে করছে ১১ দলীয় ঐক্য।
পরবর্তী কর্মসূচি ও আন্দোলনের ছক জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামীকাল রোববারের মধ্যে যদি সংস্কার পরিষদের কোনো অধিবেশন বা সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ঈদের পর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে বড় ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ২৮ মার্চের বৈঠকেই ঠিক হবে রাজপথের আন্দোলনের ধরণ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আব্দুল কাদের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ এবং এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নেয়ামুল বশির, জাকপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ড. মুস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ জোটের শীর্ষ নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১১ দলীয় জোটের এই আলটিমেটাম নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে যখন সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি জনগণের একটি বড় অংশের আবেগের সঙ্গে জড়িত।