সারা দেশে যখন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর উৎসবের আমেজে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে, তখন একদল মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত আনন্দ বিসর্জন দিয়ে লিপ্ত রয়েছেন অন্যের মুখে হাসি বজায় রাখতে। যখন সবাই পরিবারের সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে ঈদের বিশেষ খাবারের স্বাদ নিচ্ছেন, তখন Law Enforcement এজেন্সির হাজারো সদস্য প্রখর রোদ কিংবা ক্লান্তিকর শিফটে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত করছেন নাগরিকদের Public Safety। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই সদস্যদের কাছে উৎসব মানেই বাড়তি দায়িত্ব, আর নাগরিকের নিরাপত্তাই তাদের প্রকৃত ঈদ আনন্দ।
উৎসবের সমীকরণে যখন ‘পেশাদারিত্ব’ই মুখ্য
ঈদের ছুটিতে রাজধানী যখন প্রায় জনশূন্য, তখনো রাজপথের মোড়ে মোড়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ সদস্যরা। বিশেষ করে Traffic Management-এর দায়িত্বে থাকা সদস্যদের ঈদ কাটে রাজপথের ধুলোবালি আর কোলাহলের মধ্যেই। অধিকাংশ সদস্যেরই মেলেনি ঈদের ছুটি। প্রিয়জনের সান্নিধ্যের চেয়ে তাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব বা ‘Duty First’ নীতি।
মোহাম্মদপুরের রাজপথ: যেখানে ডিউটিই ঈদ আনন্দ
শনিবার (২১ মার্চ) ঈদের দিন দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক চিলতে পেশাদারিত্বের প্রতিচ্ছবি। সেখানে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য মো. সাকিলের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও দায়িত্ব পালনে তিনি অবিচল। সাকিল জানান, সকাল ৬টায় দায়িত্ব শুরু করেছেন তিনি। ইচ্ছা ছিল ঈদের নামাজে শামিল হওয়ার, কিন্তু রাস্তার ট্রাফিক প্রেশার আর শৃঙ্খলার তাগিদে সেই সুযোগ মেলেনি।
সাকিল বলেন, “ছুটির দিন হলেও আমাদের চাপ কম নেই। অনেক সহকর্মী ছুটিতে থাকায় আমাদের ডাবল শিফটে কাজ করতে হচ্ছে। দুপুর ২টায় ডিউটি শেষ করে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার রাত ১০টায় নামতে হবে রাস্তায়। এই রুটিন এখন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।”
স্মৃতিতে যখন ভিড় করে প্রিয়জনের মুখ
একই এলাকায় কর্মরত আরেক ট্রাফিক সদস্য মো. সোহাগের কণ্ঠে ঝরে পড়ল কিছুটা আবেগ। তিনি বলেন, “বাড়িতে ছোট মেয়েটা পথ চেয়ে বসে থাকে বাবা কখন আসবে। মাঝেমধ্যে খারাপ লাগে ঠিকই, কিন্তু যখন দেখি মানুষ নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরছে বা উৎসব করছে, তখন নিজের দুঃখটা ভুলে যাই। জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকাটাই এখন আমাদের কর্তব্য।”
পুলিশ সদস্যদের এই আত্মত্যাগ কেবল ব্যক্তিগত আবেগের উর্ধ্বে নয়, বরং এটি তাদের পেশাগত শৃঙ্খলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন যোগ দেওয়া সদস্যদের জন্য শুরুতে এটি কিছুটা কষ্টের হলেও, সময়ের সাথে সাথে নাগরিকের নিরাপত্তাকেই তারা নিজেদের প্রাপ্তি হিসেবে মেনে নেন।
রাজধানীর নিরাপত্তায় নিশ্ছিদ্র ‘সিকিউরিটি প্রটোকল’
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সূত্রে জানা গেছে, ঈদের এই দীর্ঘ ছুটিতে রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ Security Protocol। প্রায় ১৬ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীর নিরাপত্তায়। ফাঁকা রাজধানীর আবাসিক এলাকা, শপিং মল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত টহল ও তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের ছুটিতে ঢাকা যখন খালি হয়ে যায়, তখন চুর-ডাকাত বা অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এই সময়টিতে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই। Holiday Security নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সিসিটিভি মনিটরিং ও ড্রোন টহলও জোরদার করা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।
উপসংহার
উৎসবের এই দিনে যখন পুরো দেশ বিশ্রামে, তখন এই সম্মুখসারির যোদ্ধারা লড়ছেন অদৃশ্য এক যুদ্ধের বিরুদ্ধে—তা হলো জননিরাপত্তা বজায় রাখা। তাদের নেই কোনো নির্দিষ্ট কাজের সময়, নেই পরিবারের সঙ্গে সেমাই খাওয়ার সুযোগ। তবুও তারা হাসিমুখে দায়িত্ব পালন করছেন। এই মানুষগুলোর ত্যাগ আর নিষ্ঠার কারণেই কোটি মানুষ নিশ্চিন্তে পালন করতে পারছে তাদের শ্রেষ্ঠ উৎসব। পরিশেষে বলা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই নিরলস পরিশ্রমই আমাদের সমাজ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।