দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর এক অনন্য সাধারণ ইতিহাসের সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকার জাতীয় ঈদগাহ ময়দান। দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিরতি ভেঙে একই সামিয়ানার নিচে, এক কাতারে দাঁড়িয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের এই অভিন্ন উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মৈত্রীর বার্তা বহন করছে।
শনিবার (২১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের এই প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সম্মানিত খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক এই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করেন।
ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন জাতীয় ঈদগাহের ইতিহাসে এই দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৮০-এর দশকের পর এই প্রথম দেশের শীর্ষ দুই ব্যক্তিত্বকে একসঙ্গে একই ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করতে দেখল দেশবাসী। নামাজ শুরুর আগে থেকেই ঈদগাহ ময়দান ও এর আশপাশের এলাকায় ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী যখন নির্ধারিত স্থানে এসে পৌঁছান, তখন উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে এক ধরনের অভূতপূর্ব উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়। নামাজ শেষে তারা একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রথা ও শিষ্টাচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা দিয়েছে।
লাখো মুসল্লির পদচারণায় জনসমুদ্র রাজধানীর অধিকাংশ পথের মোহনা যেন আজ মিশে গিয়েছিল জাতীয় ঈদগাহের প্রাঙ্গণে। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই ঈদগাহের মূল প্যান্ডেল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ভেতরে জায়গা না পেয়ে হাজার হাজার মুসল্লি কদম ফোয়ারা, শিক্ষা ভবন ও সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন প্রধান রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করেন। জামাতে অংশ নিতে আসা শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাবা কিংবা পরিবারের বড়দের হাত ধরে আসা শিশুদের রঙিন পোশাকে ঈদগাহ ময়দান এক বর্ণিল রূপ ধারণ করে। প্রবীণ এবং নারীদের জন্যও ছিল আলাদা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা।
মোনাজাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ প্রার্থনা নামাজ পরবর্তী খুতবা শেষে এক বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। মোনাজাতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় সমৃদ্ধি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর (Muslim Ummah) শান্তি ও ঐক্য কামনায় আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা করা হয়। বিশেষ করে নতুন সরকারের ‘Success’ বা সফলতা এবং দেশের চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রা যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, সেই দোয়া করেন লাখো মুসল্লি। নামাজ শেষে সব ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে আলিঙ্গন করার চিরাচরিত দৃশ্যটি এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা জাতীয় ঈদগাহে এবার ভিআইপি (VIP) এবং সাধারণ মুসল্লিদের জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রায় ৩৩০ জন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গসহ প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ মুসল্লির জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়। নারীদের জন্য পর্দা ঘেরা পৃথক স্থানে কয়েক হাজার নারীর নামাজ আদায়ের সুব্যবস্থা ছিল। পুরো এলাকাটি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে একটি ‘Security Protocol’-এর আওতায় আনা হয়েছিল, যাতে মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে ইবাদত সম্পন্ন করতে পারেন।
রাজধানীর অন্যান্য জামাত জাতীয় ঈদগাহের পাশাপাশি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদেও প্রতি বছরের মতো ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে সকাল ৭টা ও ৮টার প্রথম দুটি জামাত সম্পন্ন হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (Islamic Foundation) তথ্যমতে, পর্যায়ক্রমে আরও তিনটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়াও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও খেলার মাঠে স্থানীয়ভাবে শত শত ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জাতীয় ঈদগাহের আজকের এই চিত্র কেবল একটি ধর্মীয় জমায়েত নয়, বরং এটি জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার এক নতুন দিগন্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।