ঢাকা: দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর দেশজুড়ে বইছে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী প্রথম ঈদের হাওয়া। ফ্যাসিবাদের পতন আর ছাত্র-জনতার অদম্য সাহসে অর্জিত ‘নতুন বাংলাদেশে’ পবিত্র ঈদুল ফিতরকে স্বাগত জানাতে রাজধানীতে এক বর্ণাঢ্য ‘ঈদ আনন্দ মিছিল’ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ। শুক্রবার (২০ মার্চ) রাতে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে শুরু হওয়া এই মিছিলটি রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে।
উৎসবের রঙে জুলাই বিপ্লবের চেতনা মিছিলটি বায়তুল মোকাররম থেকে শুরু হয়ে পুরানা পল্টন ও বিজয়নগর এলাকা প্রদক্ষিণ করার সময় রাজপথে শত শত নেতা-কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী এই প্রথম ঈদে সাধারণ মানুষের মনে যেমন উচ্ছ্বাস ছিল, তেমনি জামায়াতের এই মিছিলে ধ্বনিত হয়েছে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন। তার সঙ্গে মিছিলে সংহতি জানান বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম এবং জামায়াতের মহানগর কর্মপরিষদ সদস্য কামরুল আহসান ও শাহীন আহমেদ খানসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
ন্যায় ও ইনসাফ কায়েমের আহ্বান মিছিল পরবর্তী এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ড. হেলাল উদ্দিন এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ঈদুল ফিতর আমাদের ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার শিক্ষা দেয়। আমরা যদি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামী আদর্শ অনুসরণ করে সমাজে ‘Social Justice’ বা ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করতে পারি, তবেই রমজানের শিক্ষা সার্থক হবে।” তিনি উল্লেখ করেন, প্রকৃত ঈদের খুশি তখনই সম্ভব যখন সমাজে কোনো শোষণ থাকবে না।
সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ভূমিকা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ড. হেলাল উদ্দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেন। তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশবাসী দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। বর্তমান নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। মানুষ এখন মৌলিক অধিকারের ‘Security’ বা নিশ্চয়তা চায়।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে সংসদের প্রধান ‘Opposition Party’ হিসেবে সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে এই সহযোগিতা হবে গঠনমূলক। রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of Speech) এবং দ্বিমত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে জামায়াত সংসদের ভেতরে ও বাইরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণের ডাক সমাবেশে বক্তারা জুলাই আন্দোলনে আত্মদানকারী শহীদ এবং আহত যোদ্ধাদের ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করেন যে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ‘Political Movement’ চলেছে, ঠিক সেভাবেই এখন দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত এক আধুনিক, মানবিক ও নিরাপদ জনপদ গড়ে তোলাই হবে শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হেলাল উদ্দিন দল-মত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “ঈদ হলো ঐক্যের প্রতীক। এই সম্প্রীতির চেতনা যদি অটুট থাকে, তবেই আমরা একটি শোষণহীন আদর্শ সমাজ উপহার দিতে পারব।” সমাবেশ শেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয় এবং আবারও সকলকে আন্তরিক ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানানো হয়।