ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র ‘দিয়েগো গার্সিয়া’ দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের এই যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে—ইজরায়েলের এমন দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে একটি পরিকল্পিত ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ (False Flag) বা সাজানো ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ইজরায়েলি দাবি ও ইরানের সরাসরি প্রত্যাখ্যান সোমবার (২৩ মার্চ) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর একটি বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, “বিশ্ব এখন ইজরায়েলের এই পুরোনো ও অবিশ্বস্ত ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ কাহিনী শুনতে শুনতে ক্লান্ত। এটি মূলত ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার অজুহাত মাত্র।”
উল্লেখ্য, ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন হলো এমন এক ধরণের কৌশল যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষের পরিচয়ে হামলা চালিয়ে বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করে বা যুদ্ধের উসকানি দেয়।
ন্যাটোর সংশয় ও ‘অবিশ্বাস্য’ বয়ান মজার বিষয় হলো, ইজরায়েলের এই চাঞ্চল্যকর দাবি খোদ ন্যাটোর (NATO) ভেতরেই সংশয় তৈরি করেছে। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জানিয়েছেন যে, দিয়েগো গার্সিয়ায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) ছিল বলে ইজরায়েল যে দাবি করেছে, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পায়নি এই সামরিক জোট। ইরানের মুখপাত্র বাঘাই এই বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, স্বয়ং ন্যাটো মহাসচিবও যেখানে ইজরায়েলের অপতথ্যকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, সেখানে এই নাটকের অসারতা স্পষ্ট হয়ে যায়।
৪০০০ কিলোমিটার পাল্লা: লন্ডন কি তবে নাগালে? মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ (WSJ) দাবি করেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবারের মধ্যে দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও সেগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। তবে ইজরায়েলি সামরিক প্রধান ইয়াল জামিরের দাবিটি আরও ভয়ানক। তাঁর মতে, ইরান এই হামলায় ৪,০০০ কিলোমিটার পাল্লার দুই-পর্যায়ের অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
যদি এই দাবি সত্যি হয়, তবে তা বৈশ্বিক সামরিক সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন আনবে। কারণ ৪,০০০ কিলোমিটার পাল্লার অর্থ হলো—ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে সরাসরি যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি এনবিসি-কে (NBC) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান বিশ্বশান্তির কথা মাথায় রেখে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ইচ্ছাকৃতভাবে ২,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে।
লন্ডনের প্রতিক্রিয়া ও দিয়েগো গার্সিয়ার গুরুত্ব যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপার ইরানের তথাকথিত ‘বেপরোয়া হুমকির’ নিন্দা জানালেও স্পষ্ট করেছেন যে, ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বৃহত্তর যুদ্ধে জড়াতে চায় না। অন্যদিকে, ব্রিটিশ আবাসন সচিব স্টিভ রিড জানিয়েছেন, লন্ডনে হামলার সক্ষমতা বা পরিকল্পনা ইরানের আছে বলে ব্রিটেনের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট ইন্টেলিজেন্স (Intelligence) নেই।
দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিটি মূলত ভারত মহাসাগরে পশ্চিমা শক্তির একটি ‘Strategic Hub’। প্রায় ২,৫০০ জন সামরিক কর্মী সমৃদ্ধ এই ঘাঁটিটি এর আগে ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে মার্কিন বোমারু বিমানের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলায় এই ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে বৈশ্বিকভাবে কোণঠাসা করতেই ইজরায়েল এই হামলার খবর ছড়িয়েছে। তবে ন্যাটোর অনড় অবস্থান এবং ব্রিটেনের সতর্ক প্রতিক্রিয়ায় আপাতত এই উত্তেজনা বড় ধরণের সংঘাতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।