নাড়ির টানে শিকড়ের কাছে ফেরার পালা শেষ। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে আবারও কর্মব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। বুধবার (২৫ মার্চ) সকাল থেকেই রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে ঘরে ফেরা মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যাত্রীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে টার্মিনাল এলাকা।
ভোরের আলোয় সদরঘাটে উপচে পড়া ভিড়
দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে বিশেষ করে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা বড় বড় লঞ্চগুলো বুধবার ভোরের আলো ফোটার আগেই সদরঘাটে ভিড়তে শুরু করে। সারারাত নৌপথের প্রশান্তি গায়ে মেখে যাত্রীরা যখন ঢাকার মাটিতে পা রাখছেন, তখন তাদের চোখেমুখে ছিল ছুটির আমেজ কাটিয়ে কাজে ফেরার এক মিশ্র অনুভূতি। মূলত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছেড়ে আসা লঞ্চগুলো কোনো ধরনের বড় বিপত্তি ছাড়াই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোয় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসের দীর্ঘ যানজট এবং মহাসড়কের ঝুঁকি এড়াতে তারা ‘সেফ ট্রাভেল’ (Safe Travel) হিসেবে নৌপথকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা পরিবার ও শিশু নিয়ে ভ্রমণ করছেন, তাদের কাছে লঞ্চের কেবিন বা ডেকে যাতায়াত অনেক বেশি আরামদায়ক ও নিরাপদ মনে হয়েছে।
ছুটির ক্যালেন্ডার ও অফিস যাত্রার সমীকরণ
এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা সাত দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। গত ২১ মার্চ (শনিবার) সারা দেশে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ঈদ উদযাপিত হয়। দীর্ঘ এই ছুটির পর মঙ্গলবার থেকেই অনেক সরকারি ও বেসরকারি অফিস খুলেছে। তবে যারা মাঝের এই দুই কার্যদিবসে বাড়তি ছুটি নিতে পেরেছেন, তারা সপ্তাহান্তের শুক্র ও শনিবারের ছুটি মিলিয়ে একবারে ঢাকায় ফিরছেন।
টার্মিনালে অপেক্ষারত এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, “পরিবারের সঙ্গে ঈদের সময়টা দারুণ কেটেছে। অফিসের ‘ডেডলাইন’ (Deadline) সামলাতে বুধবারই ঢাকায় ফিরতে হলো। লঞ্চে কোনো ধরনের ভোগান্তি হয়নি, যা বেশ আশাব্যঞ্জক।”
পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা
যাত্রীদের নিরাপত্তায় সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা চোখে পড়ার মতো ছিল। বিআইডব্লিউটিএ (BIWTA) কর্তৃপক্ষ লঞ্চ থেকে যাত্রী নামার ক্ষেত্রে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্য বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে। তবে লঞ্চ থেকে নামার পর বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা পেতে যাত্রীদের কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে এবং অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগও করছেন কেউ কেউ।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে ‘রোড নেটওয়ার্ক’ (Road Network) উন্নত হলেও নৌপথের ঐতিহ্য এবং আরামদায়ক ভ্রমণের কারণে এখনও বড় একটি অংশ লঞ্চের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট’ (Public Transport) ব্যবস্থাপনায় নৌপথের গুরুত্ব অপরিসীম।
ছুটি শেষে মানুষ ফেরার সঙ্গে সঙ্গে স্থবির ঢাকা আবারও তার পুরনো ব্যস্ততায় ফিরেছে। যানজটহীন রাজপথগুলো ধীরে ধীরে যানবাহনের চাপে ভারী হয়ে উঠছে। জীবিকার টানে ঘর ছেড়ে আবারও কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার এই ধারা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।