মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitical Landscape) বইছে যুদ্ধের উত্তপ্ত হাওয়া। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যখন চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে, ঠিক তখনই এই অঞ্চলে আরও কয়েক হাজার অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন (Pentagon) সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর অন্যতম দুর্ধর্ষ ও অভিজাত ইউনিট ‘৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন’-এর বিপুল সংখ্যক সেনাকে এই অভিযানে অংশ নিতে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হতে পারে।
পেন্টাগনের রণকৌশল ও সেনাসংখ্যা
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে প্রায় ১,০০০ সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। তবে সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে এই সংখ্যা ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই ব্রিগেডটিকে মূলত একটি ‘রেডি ইউনিট’ (Ready Unit) বা প্রস্তুত ইউনিট হিসেবে রাখা হবে, যারা প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে (Tactical Operation) অংশ নিতে পারবে।
২০২০ সালে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পরও এই ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনকে একই কায়দায় মোতায়েন করা হয়েছিল। ফলে এবারের এই পদক্ষেপটি কেবল সাধারণ প্রতিরক্ষা নয়, বরং ইরানের ভূখণ্ডের ভেতরে বিশেষ অভিযানের (Military Operation) আগাম সংকেত হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিমুখী অবস্থান: কূটনীতি না যুদ্ধ?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন একদিকে ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার দাবি করলেও, অন্যদিকে পেন্টাগনের এই যুদ্ধপ্রস্তুতি নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টেবিলে সবসময়ই সব ধরনের ‘মিলিটারি অপশন’ (Military Options) খোলা থাকে।”
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প যখন ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলার হুমকি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক তার পরদিনই এই অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর খবরটি সামনে এলো। যদিও তেহরান শুরু থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।
বিশ্ববাজার ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কেবল যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, বরং অস্থির করে তুলেছে বিশ্ববাজারকে। তেলের দাম ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বড় বড় টেক জায়ান্ট (Tech Giant) এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির ‘মার্কেট ভ্যালু’ (Market Value) এবং সরবরাহ চেইন (Supply Chain) ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও সংঘাতের ঝুঁকি
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০,০০০ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। নতুন করে এই কয়েক হাজার ‘এলিট’ ফোর্স যুক্ত হলে তা এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যকে আরও সুসংহত করবে ঠিকই, তবে সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে অভিযানের সম্ভাবনা সংঘাতকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। সামরিক সূত্রগুলো বলছে, সরাসরি ইরানের ভেতরে সেনা পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও না হলেও, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অভিযানের জন্য বাহিনীকে ‘কমব্যাট রেডি’ (Combat Ready) রাখা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত এই মোতায়েনের কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি না হলেও, পেন্টাগন যেকোনো সময় চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে হোয়াইট হাউসের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত কূটনীতিতেই আস্থা রাখবেন, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধের দামামা বাজবে?