মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের দামামা আর রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানকে একটি সুনির্দিষ্ট ১৫ দফার প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যা মূলত এই অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এবং সংঘাত বন্ধের একটি ‘রোডম্যাপ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই স্পর্শকাতর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ১৫ দফার রূপরেখা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এবং ‘সিএনএন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন এই প্রস্তাবটি একটি ‘Diplomatic Channel’ বা বিশেষ কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তেহরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী (Mediator) হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। ইসলামাবাদ ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যদি ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষই সম্মতি দেয়, তবে তারা সরাসরি আলোচনার জন্য একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো এই ১৫ দফার প্রস্তাবে মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে: ১. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear Program) সীমিতকরণ। ২. ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট কাঠামো। ৩. হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বা Maritime Security নিশ্চিত করা।
ট্রাম্পের দাবি বনাম তেহরানের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে, তেহরানের সঙ্গে ইতোমধ্যে ১৫টি বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে এবং ইরান একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ‘খুবই আগ্রহী’। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো বা Energy Infrastructure-এর ওপর সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন।
তবে তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে শুরু থেকেই আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে ইরানি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানানো হয় যে, পর্দার আড়ালে দুই দেশের মধ্যে ‘যোগাযোগ’ চলছে। ওই সূত্রটি আরও জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানের জন্য একটি টেকসই এবং বাস্তবসম্মত (Sustainable Proposal) প্রস্তাব শুনতে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়।
সংঘাতের চতুর্থ সপ্তাহ ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পরোক্ষ যুদ্ধ যখন চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে, তখন বিশ্ব অর্থনীতি এবং তেলের বাজার চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই ১৫ দফার প্রস্তাবটি মূলত একটি ‘Geopolitical Strategy’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি কমিয়ে আনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কোনো কার্যকর সমঝোতা হয়, তবে তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল বৈদেশিক নীতি বা ‘Foreign Policy’-এর জয় হিসেবে গণ্য হবে।
এদিকে, পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ‘মিলিটারি অপশন’ও খোলা রেখেছে। একদিকে কূটনীতি আর অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতির এই ‘Dual Strategy’ তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে কতটা বাধ্য করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
আপাতত সবার নজর পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং তেহরানের চূড়ান্ত উত্তরের দিকে। এই ১৫ দফার প্রস্তাবটি কি কেবল যুদ্ধ বিরতির একটি দলিল, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী শান্তির চাবিকাঠি—তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।