১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এর ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় থাকলেও জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের জেরে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আসছে তেহরান। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ইরানকে এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ— হরমুজ প্রণালি।
অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিগন্ত
সমরবিদ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের পরিকল্পনা সফল হলে দেশটির ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। মেরিটাইম ডাটা ফার্ম লয়েডস লিস্ট ইনটিলিজের তথ্য অনুযায়ী, ইরান তাদের জলসীমায় একটি বিশেষ ‘সেইফ করিডর’ বা নিরাপদ পথ ঘোষণা করেছে। এই পথ ব্যবহার করে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো তেলের জাহাজ পাঠাতে পারছে। তবে এর বিনিময়ে ইরান প্রতিটি তেলের ব্যারেল প্রতি ১ ডলার করে টোল নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে।
বিপুল আয়ের সম্ভাবনা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। যদি ইরান ব্যারেল প্রতি ১ ডলার টোল আদায় নিশ্চিত করতে পারে, তবে প্রতিদিন তাদের আয় হবে ২০ মিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে বছরে আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭.২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যদি অর্ধেক পরিমাণ তেলও এই পথে পরিবাহিত হয়, তবুও ইরান বছরে ৩.৬৫ বিলিয়ন ডলার আয় করতে সক্ষম হবে, যা তাদের জাতীয় অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটাতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
আমেরিকার আধিপত্য ও চ্যালেঞ্জ
ক্যারিক রায়ানার মতো বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের একক আধিপত্য বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হওয়া সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করতে ওয়াশিংটনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি মাইন সরানোর জন্য অন্য দেশের সাহায্য নিতে হওয়া আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন তুলছে।
বদলে যাওয়া ভূ-রাজনীতি
ইরানের এই কৌশল সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো নতুন করে চিন্তায় পড়বে। তারা কি দীর্ঘদিনের মিত্র সুপার পাওয়ার আমেরিকাকে সমর্থন করবে, নাকি আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইরানকে গুরুত্ব দেবে—তা নিয়ে এক ধরণের সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির পর ইরান যদি তাদের মিত্র হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগরেও একই ধরনের আধিপত্য বিস্তার করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তেহরানই হয়ে উঠবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি।