বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের (Energy Crisis) প্রেক্ষাপটে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় সিটি করপোরেশন এলাকার স্কুল-কলেজগুলোতে সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন বা ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ (Blended Learning) পদ্ধতি চালুর বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপন করার কথা রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতেই নির্ধারিত হবে শিক্ষার্থীদের আগামীর পাঠদান পদ্ধতি।
প্রস্তাবিত ‘৩+৩’ মডেল: কীভাবে চলবে শিক্ষা কার্যক্রম?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, সপ্তাহে মোট ছয় কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিন অনলাইনে এবং তিন দিন সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ‘Hybrid Model’-এ এক দিন অন্তর অন্তর অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস চলবে। তবে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনলাইন ক্লাসের দিনগুলোতেও শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে এবং সেখান থেকেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাঠদান পরিচালনা করতে হবে। বিজ্ঞান বা কারিগরি বিষয়ের ব্যবহারিক (Practical) ক্লাসগুলো যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য সেগুলো সশরীরে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য ও অংশীজনদের মতামত
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিস্থিতির চরম অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যেই এই মিশ্র পদ্ধতির কথা ভাবা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, রমজানের ছুটি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইতোমধ্যেই অনেক ক্লাস নষ্ট হয়েছে, যা পুষিয়ে নিতে বর্তমানে শনিবারও স্কুল খোলা রাখা হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে— প্রায় ৫৫ শতাংশ ‘Stakeholders’ বা অংশীজন বর্তমানে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণ (Socialization) যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য পুরোপুরি অনলাইনে না গিয়ে এই ব্লেন্ডেড মডেলটিই বিবেচনার শীর্ষে রয়েছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ
সরকারের এই সম্ভাব্য উদ্যোগের সংবাদে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল পেরেন্টস ফোরাম। সংগঠনের সভাপতি একেএম আশরাফুল হক এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
তাদের আপত্তির প্রধান কারণগুলো হলো: ১. পরীক্ষার সূচি: মে মাসেই সাধারণ স্কুলগুলোর ‘Session Final’ এবং ইংরেজি মাধ্যমের ‘O-Level’ ও ‘A-Level’ পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এই চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময়ে অনলাইন ক্লাসকে তারা ‘আত্মঘাতী’ মনে করছেন। ২. আর্থিক চাপ: উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইসের বাড়তি খরচ বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে অভিভাবকদের ওপর নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। ৩. তদারকির অভাব: কর্মজীবী মা-বাবাদের পক্ষে সন্তানদের অনলাইন ক্লাস তদারকি করা প্রায় অসম্ভব।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অভিভাবকদের ৪ বিকল্প প্রস্তাব
অনলাইন ক্লাসের পরিবর্তে পড়াশোনার মান বজায় রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য পেরেন্টস ফোরাম কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে:
৪ দিন সশরীরে ক্লাস: ৩+৩ মডেল বাতিল করে সপ্তাহে ৪ দিন সশরীরে ক্লাস চালু রেখে বাকি ৩ দিন স্কুল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা (যাতে যাতায়াত ও বিদ্যুৎ উভয়ই সাশ্রয় হয়)।
কার্যঘণ্টা হ্রাস: প্রতিদিনের ক্লাসের সময় কিছুটা কমিয়ে আনা।
এসি ও কৃত্রিম আলো নিয়ন্ত্রণ: শ্রেণিকক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার নিশ্চিত করা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দেশ
আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবেন। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নাকি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান—কোন বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আজ বিকেলেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে দেশবাসী এই স্পর্শকাতর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে পারবে।