• দেশজুড়ে
  • চট্টগ্রামে ডিজেল সংকট: নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি ভাড়া, ভোগান্তিতে জনতা

চট্টগ্রামে ডিজেল সংকট: নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি ভাড়া, ভোগান্তিতে জনতা

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
চট্টগ্রামে ডিজেল সংকট: নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি ভাড়া, ভোগান্তিতে জনতা

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলাজুড়ে তীব্র ডিজেল সংকটের অজুহাতে গণপরিবহনে চরম ভাড়া নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বাস, হিউম্যান হলার (লেগুনা) ও টেম্পো চালকদের বিরুদ্ধে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী যাত্রী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। পাম্পে তেল নেই, রাস্তায় গাড়ি কম বিগত কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রামের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ‘ডিজেল নেই’ সংকেত ঝুলতে দেখা গেছে। বিশেষ করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ডিপো থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় নগরীর পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক পাম্প কয়েক ঘণ্টা তেল বিক্রির পর ‘সরবরাহ শেষ’ বলে পাম্প বন্ধ করে দিচ্ছে। তেলের এই ঘাটতিকে পুঁজি করে একদল অসাধু মালিক ও চালক কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাস্তা থেকে গাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন। ফলে সড়কে গণপরিবহনের সংখ্যা গত কয়েকদিনের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম থাকায় স্টপেজগুলোতে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। এই সুযোগে যেসব গাড়ি রাস্তায় চলছে, তারা ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকাচ্ছে। নগরীর বহদ্দারহাট থেকে জিইসি মোড় যেখানে ভাড়া ১৫ টাকা, সেখানে যাত্রীদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। একইভাবে পতেঙ্গা, নিউ মার্কেট ও চকবাজার রুটেও দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে চালক ও সহকারীরা অভদ্র আচরণ করছেন এবং গাড়ি থেকে নেমে যেতে বলছেন। নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় অপেক্ষারত এক বেসরকারি চাকুরিজীবী বলেন, "এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কোনো বাস পাচ্ছি না। দুই-একটা এলেও ভাড়া চাচ্ছে আকাশচুম্বী। তেলের সংকট পাম্পে, কিন্তু পকেট কাটছে আমাদের।" চালকদের দাবি পরিবহন চালকদের দাবি, তারা পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। অনেককে কালোবাজার থেকে চড়া দামে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে নিতেই তারা বাড়তি ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের এক নেতা জানান, সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক গাড়ি রাস্তায় নামানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি সমর্থনযোগ্য নয় এবং তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডিজেল সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। সকাল সাতটায় ঘর থেকে বেরিয়েছি স্কুলে যাওয়ার জন্য। ৫০ মিনিটেরও বেশি সময় দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু কোনো গাড়িতে উঠতে পারছি না। অনেকক্ষণ পর একটি লোকাল বাস বা সিএনজি অটোরিকশা এলেও তাতে জায়গা মেলে না। তার ওপর আমরা নারীরা ধাক্কাধাক্কির মধ্যেও উঠতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে সিএনজি নিয়ে কর্মস্থলে যেতে হয়েছে। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি—১০০ টাকার ভাড়া দিতে হয়েছে ১৮০ টাকা। এভাবেই নিজের দুর্ভোগের কথা জানাচ্ছিলেন নগরীর এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সামিরা আক্তার। শুধু তিনি নন, রোববার সকাল থেকে কর্মস্থলগামী প্রায় সব যাত্রীই বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন। দেশে চলমান ডিজেল সংকটের কারণে রাস্তায় গণপরিবহন কমে গেছে। ফলে যাত্রীদের কর্মস্থল কিংবা বাসায় পৌঁছাতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আর এ সুযোগে কিছু পরিবহন শ্রমিক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও লোকাল বাস না পেয়ে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে সিএনজি অটোরিকশা কিংবা রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যে যাচ্ছেন। তবে সেখানেও গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। অনেক ক্ষেত্রে এসব যানবাহনও পর্যাপ্ত পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য দিনের তুলনায় সড়কে লোকাল বাসের সংখ্যাও কম দেখা গেছে।

নগরীর বহদ্দারহাট মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা আসমা সুলতানা ও ফারজানা আক্তার—দুজনই একে অপরের অপরিচিত। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর তারা আলাপ করে জিইসি মোড়ে যাওয়ার জন্য ১৯০ টাকায় একটি সিএনজি ভাড়া নেন। তাদের একজন জিইসির একটি মেডিকেল সেন্টারে এবং অন্যজন একটি ভিসা এজেন্সিতে চাকরি করেন। একা এত ভাড়া বহন করা সম্ভব না হওয়ায় তারা একসঙ্গে ভাড়া ভাগাভাগি করে গন্তব্যে যান। এদিকে নতুনব্রীজ থেকে ছেড়ে আসা ৪ নম্বর, কালুঘাট থেকে আসা ১০ নম্বর ও ১ নম্বর বাসে যাত্রী ওঠানামা নিয়েও বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। অনেক হেলপার নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী না তুলে সীমিত সংখ্যক যাত্রী তুলছেন। এতে যাত্রীদের সঙ্গে চালক-হেলপারদের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। নাছির হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, “ডিজেলের সংকট আছে, সেটা ঠিক। কিন্তু গ্যাসচালিত গাড়িগুলো কেন ভাড়া বাড়াচ্ছে? সবাই সুযোগ নিচ্ছে। এখন ডিজেল না থাকায় ভাড়া বাড়িয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা কি আবার ভাড়া কমাবে? প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো জরুরি, না হলে এই নৈরাজ্য চলতেই থাকবে।” দুর্ভোগে পড়েছেন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরাও। অনেককে দীর্ঘ সময় সড়কে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে, কেউ কেউ আবার হেঁটেই গন্তব্যে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, তারাও চাপে রয়েছেন। পেট্রোলপাম্পে তেল সংকটের কারণে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। ডিজেলচালিত যানবাহন কমে যাওয়ায় গ্যাসচালিত গাড়ির ওপর চাপ বেড়েছে, ফলে ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি তাদের। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, ডিজেলের দামের কারণে গাড়ি ভাড়া বেড়েছে। তবে গ্যাসের গাড়ির ভাড়া যারা ভাড়াচ্ছে তারা সুযোগ সন্ধানী। এছাড়া যেকোনো বৈশিক্য সমস্যা আমোদের সবাইকে এক সাথে মোকাবিলা করতে হবে। ডিজেলের দাম বাড়ায় শুধু যাত্রীরাই দূর্ভোগে পড়েনি, স্বল্প আয়ের পরিবহন শ্রমিকদেরও জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আগে তাদের আয় বেশি ছিলো এখন কমেছে। তাই যেটা বেশি মনে হচ্ছে সেটি হিসেব করলে বেশি নয়। এছাড়া আমাদের সংগটনের আওয়ায় যেসব পরিবহস আছে তারা কোনো অনৈতিক কাজ করলে আমরা অভিযোগ তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতে চাইলে তাদের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। এদিকে নগরীর বিভিন্ন পেট্রোলপাম্পে ডিজেল নিতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক চালক অভিযোগ করছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি পাচ্ছেন না। সার্বিক পরিস্থিতিতে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।