• মতামত
  • পয়লা বৈশাখ: গ্রামের মাটির গন্ধে নতুন বছরের শুরু

পয়লা বৈশাখ: গ্রামের মাটির গন্ধে নতুন বছরের শুরু

মতামত ১ মিনিট পড়া
পয়লা বৈশাখ: গ্রামের মাটির গন্ধে নতুন বছরের শুরু

মুহাম্মদ নজরুল সিকদার লেখক- শিক্ষার্থী চকরিয়া,কক্সবাজার।

পয়লা বৈশাখ এলেই আমার চোখে ভেসে ওঠে গ্রামের সেই চিরচেনা ভোরের দৃশ্য। বছরের অন্য দিনের চেয়ে এই সকালটা যেন একটু আলাদা। আকাশটা থাকে পরিষ্কার, বাতাসে থাকে মাটির গন্ধ, আর মানুষের মুখে ফুটে ওঠে নতুন বছরের স্বপ্নের হাসি। নতুন বছরের প্রথম সূর্য যেন সবাইকে নতুন করে বাঁচার সাহস দেয়।

ভোর হতেই মসজিদের আজানের সুরে শুরু হয় নতুন বছরের সকাল। উঠোন ঝাড়ু দেন মা, ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়, চারদিকে সাজ সাজ রব। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি—পয়লা বৈশাখ মানেই ঘর গোছানো, নতুন বা পরিষ্কার কাপড় পরা, আর নতুন আশায় দিন শুরু করা।

সকাল বাড়ার সাথে সাথে গ্রামের পথগুলো জমে ওঠে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পরে বের হয়। কেউ লাল পাঞ্জাবি পরে, কেউ নতুন শার্ট। মেয়েরা চুলে ফুল গুঁজে হাসিমুখে ঘুরে বেড়ায়। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে তখন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।

পয়লা বৈশাখে গ্রামের মানুষের মধ্যে একটা অন্যরকম মিলন দেখা যায়। একে অপরের বাড়িতে গিয়ে শুভেচ্ছা জানায় সবাই। "শুভ নববর্ষ" বলেই যেন পুরোনো সব অভিমান ভুলে নতুন করে সম্পর্ক শুরু হয়। এই দিনে মনে হয় পুরো গ্রামটাই যেন এক পরিবারের মতো হয়ে যায়।

পয়লা বৈশাখ মানেই গ্রামের মাঠে বৈশাখী মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে দোকান বসে। খেলনা, বাঁশি, মাটির তৈরি জিনিস, বেলুন, পিঠা-পুলি, জিলাপি—সব মিলিয়ে জমে ওঠে আনন্দের পরিবেশ। শিশুরা মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকে অনেক দিন ধরে। নাগরদোলায় চড়া, বাঁশি বাজানো, বেলুন হাতে দৌড়ানো—এসবই গ্রামীণ বৈশাখের বিশেষ আনন্দ।

শুধু শিশুরাই নয়, বড়রাও এই আনন্দে শামিল হয়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, কেউ চায়ের দোকানে বসে গল্প করে, কেউ আবার অনেকদিন পর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে। নতুন বছরের প্রথম দিনটি এভাবেই স্মরণীয় হয়ে ওঠে।

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে গ্রামের দোকানগুলোতেও দেখা যায় নতুন প্রস্তুতি। অনেক দোকানে হালখাতা খোলা হয়। পুরোনো হিসাব মিটিয়ে নতুন বছরের ব্যবসা শুরু করা হয়। গ্রাহকদের মিষ্টি খাওয়ানো হয়, শুভেচ্ছা জানানো হয়। এই ছোট ছোট ঐতিহ্যগুলোই গ্রামীণ জীবনের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়।

পয়লা বৈশাখে গ্রামের ঘরে ঘরে বিশেষ রান্না হয়। পান্তা ভাত, ভর্তা, শুকনা মরিচ, কখনো মাছ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম স্বাদ। অনেক জায়গায় পিঠা তৈরি করা হয়। নারিকেলের পিঠা, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা—এসব খাবারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য।

পরিবারের সবাই একসাথে বসে খাওয়ার আনন্দটাই যেন সবচেয়ে বড় সুখ। শহরের মতো বড় আয়োজন না থাকলেও গ্রামের বৈশাখের আনন্দ একেবারেই আলাদা। এখানে নেই কৃত্রিমতা, নেই আড়ম্বর—আছে শুধু মানুষের আন্তরিকতা আর ভালোবাসা।

পয়লা বৈশাখ এলেই গ্রামের মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখে। কৃষক নতুন ফসলের আশায় বুক বাঁধে। ব্যবসায়ী নতুন করে পরিকল্পনা করে। শিক্ষার্থীরা নতুন বছরে ভালো করার প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যায়। নতুন বছরের প্রথম দিন মানুষকে নতুন সাহস দেয়।

আমার কাছে পয়লা বৈশাখ মানে—গ্রামের ধুলোমাখা পথ, মাঠের সবুজ ঘাস, মানুষের হাসিমুখ আর নতুন দিনের স্বপ্ন। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়—জীবন যত কঠিন হোক, নতুন শুরু সবসময় সম্ভব।

পয়লা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়—এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর নতুন জীবনের প্রতীক। নতুন বছর আসুক নতুন আশার আলো নিয়ে। সব মানুষের জীবনে আসুক সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধি।

শুভ নববর্ষ শুভ পয়লা বৈশাখ 🌺