কাল টিউলিপ সিদ্দিকের মামলার রায়: রাজনৈতিক জীবনের মোড়
ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঢাকায় প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া একটি দুর্নীতি মামলায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য (MP) ও সাবেক সিটি মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিকের ভাগ্য নির্ধারণ হতে চলেছে আগামীকাল। এই মামলাটিতে রায় ঘোষণা করা হবে। যদি হাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটের এই এমপি দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হতে পারে। বাংলাদেশে দণ্ডপ্রাপ্ত হলে তা যুক্তরাজ্যে তার এমপি পদে থাকা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করবে।
রোববার (৩০ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর তথ্য জানানো হয়েছে। এই মামলায় টিউলিপ সিদ্দিক, তার খালা ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বোন শেখ রেহানাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
টিউলিপের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ও তার আত্মপক্ষ সমর্থন
৪৩ বছর বয়সী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে কোর অভিযোগটি হলো—তিনি তার খালা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রভাব খাটিয়ে চাপ দিয়ে ঢাকার একটি অভিজাত আবাসিক এলাকায় তার মা শেখ রেহানা (৭০), বড় ভাই রাদওয়ান (৪৫) ও বোন আজমিনা (৩৫)-এর জন্য জমি বরাদ্দ করিয়ে দিয়েছেন।
তবে শুরু থেকেই এই গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি দাবি করেছেন, এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এটি তার বিরুদ্ধে একটি উইচ হান্ট (Witch Hunt)।
যুক্তরাজ্যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সঙ্কট
ডেইলি মেইল জানিয়েছে, যদি অনুপস্থিতিতেই টিউলিপ সিদ্দিককে দোষী সাব্যস্ত করে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়, তবে হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটের এমপি হিসেবে তার পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার দাবিতে যুক্তরাজ্যে চাপ আরও তীব্র হবে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দীর্ঘ সাজা তার পাবলিক লাইফ ও পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের জন্য বড় হুমকি। একই ধরনের অভিযোগে চলতি বছরের শুরুতে তাকে সিটি মিনিস্টারের পদ থেকেও ইস্তফা দিতে হয়েছিল।
এ ছাড়া, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের (Political Analysts) মতে, এই দুর্নীতি মামলায় টিউলিপ সিদ্দিকের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুব বেশি’। এর কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন, একই অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার এই মামলার আরেক আসামি, তার খালা শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ আইনজীবী ও সাবেক মন্ত্রীদের উদ্বেগ
টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত সপ্তাহে চেরি ব্লেয়ার কেসহ (Cherie Blair QC) বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ আইনজীবী ও সাবেক মন্ত্রী বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে একটি যৌথ চিঠি দেন।
ওই চিঠিতে তারা টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চলমান এই বিচারকে ‘কৃত্রিম ও অন্যায্য’ বলে অভিহিত করেন। তারা দাবি করেন যে, টিউলিপকে কোনো যথাযথ কারণ ছাড়াই অনুপস্থিতিতে (ইন এবসেনশিয়া) বিচার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, তার নিযুক্ত আইনজীবীকেও গৃহবন্দি করে মামলার দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে এবং এমনকি তার সন্তানকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই ইন্টারন্যাশনাল প্রেশার সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার বিচারিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে, ডেইলি মেইল আরও জানিয়েছিল, বাংলাদেশে ৪ বিলিয়ন পাউন্ডের একটি বিশাল দুর্নীতি মামলায়ও তাকে ইনভেস্টিগেট করা হচ্ছে। রাশিয়া নির্মিত একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল টিউলিপ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে, যদিও সেই অভিযোগও তিনি সর্বদা অস্বীকার করে এসেছেন।
ডেইলি মেইলের তথ্য অনুযায়ী, এই বিচার প্রক্রিয়া এবং আইনজীবীদের লেখা চিঠি উভয় বিষয়েই টিউলিপ সিদ্দিক কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।