বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেছেন যে, পুরোনো সংঘাতগুলো মিটে যাওয়ার বদলে আরও তীব্রতর হচ্ছে এবং এর সমান্তরালে নতুন নতুন সংকটের কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) মস্কোর গ্র্যান্ড ক্রেমলিন প্রাসাদে নতুন নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে দেওয়া এক ভাষণে রুশ প্রেসিডেন্ট এসব মন্তব্য করেন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পুতিনের দেওয়া প্রথম কোনো প্রকাশ্য ভাষণে তার এই সতর্ক অবস্থানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কৌশলগত নীরবতা ও ভাষণের অন্তরালে বার্তা
মস্কোর আড়ম্বরপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে পুতিনকে কিছুটা হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেলেও তার বক্তব্যে ছিল গভীর কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাষণে তিনি বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কথা বললেও ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতি কিংবা ইরানে চলমান তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মতো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব ছিলেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিভিন্ন হুমকি বা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক নিয়েও তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই ‘Strategic Silence’ বা কৌশলগত নীরবতা মূলত বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাশিয়ার পরবর্তী চাল নির্ধারণের একটি অংশ।
একপাক্ষিক নীতির সমালোচনা ও ‘মাল্টিপোলার’ বিশ্বের স্বপ্ন
পুতিন তার বক্তব্যে নাম উল্লেখ না করে যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক পররাষ্ট্রনীতির (Unilateral Policy) কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে যারা নিজেদের মহাশক্তিশালী মনে করেন, তারা অন্য দেশগুলোর ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া এবং অন্যদের ওপর হুকুম জারি করাকে বৈধ মনে করছেন। তারা কোনো গঠনমূলক সংলাপে বিশ্বাসী নন, বরং একক হুকুমদারি বা ‘Monologue’-এ বিশ্বাসী।”
পুতিন পুনর্ব্যক্ত করেন যে, রাশিয়া সবসময়ই একটি ‘Multipolar World’ বা বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থার আদর্শে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেখানে কোনো একক রাষ্ট্র নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তিনি ইউরোপে একটি নতুন ‘Security Framework’ বা নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার জন্য রাশিয়ার দেওয়া প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে সম্পর্ক
বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটের পর রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অবনতি ঘটেছে। ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ ‘Military Conflict’। এই প্রেক্ষাপটে পুতিনের ভাষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আজ হোক বা কাল রাশিয়ার নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত মস্কো তার লক্ষ্যে অবিচল থাকবে।
পরিচয়পত্র প্রদানের এই প্রথাগত অনুষ্ঠানে পুতিন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ অবস্থানের বিষয়ে পরোক্ষ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিশ্বনেতারা এখন পুতিনের এই বার্তার বিপরীতে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, সেদিকেই নজর রাখছেন।