• জাতীয়
  • মুক্তিযোদ্ধার ‘ভুয়া সন্তান’ সেজে বিসিএস ক্যাডার: শ্রীঘরে সিনিয়র সহকারী সচিব কামাল

মুক্তিযোদ্ধার ‘ভুয়া সন্তান’ সেজে বিসিএস ক্যাডার: শ্রীঘরে সিনিয়র সহকারী সচিব কামাল

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
মুক্তিযোদ্ধার ‘ভুয়া সন্তান’ সেজে বিসিএস ক্যাডার: শ্রীঘরে সিনিয়র সহকারী সচিব কামাল

আপন চাচাকে পিতা সাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় জালিয়াতির আশ্রয়; আদালতের শর্ত ভঙ্গ করায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওএসডি কর্মকর্তার জামিন বাতিল।

মুক্তিযোদ্ধা কোটার অপব্যবহার এবং পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগে অবশেষে কারাগারে যেতে হলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. কামাল হোসেনকে। আপন চাচাকে ‘পিতা’ সাজিয়ে ৩৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) করা মামলায় বুধবার (২৮ জানুয়ারি) তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এই আদেশ প্রদান করেন।

জালিয়াতির সুনিপুণ ছক: যেভাবে চাচা হলেন বাবা

মামলার এজাহার ও দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, মো. কামাল হোসেনের প্রকৃত জন্মদাতা পিতা মো. আবুল কাশেম এবং মা মোছা. হাবীয়া খাতুন। তবে বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা ভোগ করার অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি তার আপন চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আহসান হাবীব এবং চাচি মোছা. সানোয়ারা খাতুনকে নিজের পিতা-মাতা হিসেবে নথিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কামাল হোসেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের সিরাজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি এবং ফিলিপনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সময় তার প্রকৃত বাবার নামই ব্যবহার করেছিলেন। তবে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্কুলের রেজিস্ট্রেশনে কৌশলে চাচার নাম ‘পিতা’ হিসেবে বসিয়ে দেন। এই জালিয়াতির ওপর ভিত্তি করেই তিনি ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OSD) হিসেবে কর্মরত আছেন।

আদালতের কঠোর অবস্থান ও জামিন বাতিল

দুদকের প্রসিকিউটর দেলোয়ার জাহান রুমি জানান, আসামি কামাল হোসেন গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর উচ্চ আদালত (High Court) থেকে চার সপ্তাহের আগাম জামিন নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২৩ ডিসেম্বর নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিজ্ঞ আদালত তাকে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সহযোগিতার শর্তে এবং বিশেষ করে ডিএনএ পরীক্ষার (DNA Test) জন্য নমুনা দেওয়ার শর্তে জামিন মঞ্জুর করেছিলেন।

তবে দুই দফায় সময় দেওয়া হলেও তিনি ডিএনএ পরীক্ষার শর্ত পালন না করে তদন্তে অসহযোগিতা করেন। শর্ত ভঙ্গের এই বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তার জামিন বাতিলের আবেদন জানানো হয়। শুনানি শেষে আদালত মনে করেন, আসামি আইনের সুবিধা নিলেও শর্ত ভঙ্গ করেছেন, যা গুরুতর অপরাধ। ফলে তার জামিন বাতিল করে তাকে সরাসরি জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম প্রতারণা

গত ২৬ ডিসেম্বর দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. মনজুরুল ইসলাম মিন্টু বাদী হয়ে এই জালিয়াতির ঘটনায় মামলাটি দায়ের করেন। দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি কেবল একটি সাধারণ জালিয়াতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ‘বিসিএস’ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র চেতনার সঙ্গে এক চরম প্রতারণা। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার (Bureaucrat) এমন জঘন্য জালিয়াতির ঘটনা প্রশাসনিক অঙ্গনেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

প্রশাসনিক ও আইনি পরিণাম

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার রায়ে যদি জালিয়াতি প্রমাণিত হয়, তবে কামাল হোসেনের কেবল চাকরিচ্যুতিই নয়, বরং বড় ধরনের কারাদণ্ডও হতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই তার বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে। একজন সিভিল সার্ভেন্ট বা আমলার কাছ থেকে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার (Public Administration) স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বর্তমানে আসামিকে পুলিশি পাহারায় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। দুদকের পক্ষ থেকে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে যাতে এই জালিয়াতির নেপথ্যে আরও কেউ জড়িত কি না তা উদ্ঘাটিত হয়।

Tags: public administration acc case administrative cadre jail news corruption news bcs fraud freedom fighter quota assistant secretary kamal hossain dna test