যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নির্মমভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে গর্ভস্থ ভ্রূণ হত্যার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই নৃশংস ঘটনায় স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী নারী।
মামলার প্রধান আসামি হলেন জি এম ফাহিম আলমগীর। তিনি মনিরামপুর পৌর এলাকার জিএম আলমগীর হোসেনের ছেলে এবং স্থানীয়ভাবে ‘ক্যাফে ফাহিম’ নামে পরিচিত। জানা গেছে, মনিরামপুর বাজারে তাঁর মালিকানায় মুনলিট ক্যাফে (Moonlit Cafe) ও গল্পকুঠি ক্যাফে নামে দুটি ক্যাফে রয়েছে।
যৌতুকের দাবিতে নির্মম অত্যাচার: তলপেটে লাথি
ভুক্তভোগী নারী একজন পিতৃহীন হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে শত অত্যাচার সহ্য করে স্বামীর সংসারে মানবেতর জীবন যাপন করছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
ভুক্তভোগীর পরিবার থেকে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই তাঁকে দশ লক্ষ টাকা যৌতুকের দাবিতে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলে অভিযুক্তরা বিষয়টি গোপন রাখতে চাপ দেয়। পরে যৌতুক আদায়ের লোভে অভিযুক্তরা তাঁকে জোরপূর্বক গর্ভপাত (Abortion) করাতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।
ভুক্তভোগী নারী গর্ভপাত করতে অস্বীকৃতি জানালে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর তাঁকে চুলের মুঠি ধরে আছাড় দেওয়া হয় এবং তলপেটে উপর্যুপরি লাথি মারা হয়। প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের সামনেই এই নৃশংস নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
হাসপাতালে নিতে বাধা ও জোরপূর্বক তালাক
এই নির্যাতনে ভুক্তভোগীর মারাত্মক রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং গর্ভস্থ ভ্রূণের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। অভিযোগে আরও বলা হয়, ভুক্তভোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্তরা তাঁকে হাসপাতালে নিতে বাধা দেয়। ঘটনার সত্যতা আড়াল করতে স্থানীয় এক কোয়াক ডাক্তারের মাধ্যমে নামমাত্র চিকিৎসা করানো হয়। পরে তাঁকে কয়েক দিন জোরপূর্বক আটক রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় এবং একপর্যায়ে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়।
পরবর্তীকালে ভুক্তভোগী নারী সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তাঁর চিকিৎসা নথি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography) প্রতিবেদনে গর্ভস্থ ভ্রূণের মারাত্মক ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সিআইডি (Criminal Investigation Department)-কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মামলার আইনজীবী মো. রবিউল ইসলাম রবি বলেন, "আদালত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। গর্ভস্থ ভ্রূণ হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকায় সিআইডি-কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।" এলাকাবাসী এই নৃশংস ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি নারী নির্যাতন ও গর্ভস্থ শিশুহত্যার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত, যা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।