পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে বড় ধরনের নাশকতার খবর পাওয়া গেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সুপরিকল্পিত ও ‘সমন্বিত’ (Coordinated Attack) হামলায় অন্তত আটজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ও পুলিশ স্টেশনে একযোগে এই হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বেলুচিস্তানে নজিরবিহীন ‘সমন্বিত’ হামলা
শনিবার ভোর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি। বিচ্ছিন্নতাবাদী বন্দুকধারীরা প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটার একাধিক পুলিশ স্টেশন লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও আত্মঘাতী হামলা (Suicide Attack) চালায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবারের হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। কোয়েটা ছাড়াও পাসনি, মাস্তুং, নুশকি এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে পরিচিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোয়াদার (Gwadar) জেলায় একযোগে হামলা চালানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, দ্রুত পালটা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কার্যকর ‘সিকিউরিটি অপারেশন’ (Security Operation)-এর ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় ৮ জন পুলিশ সদস্যের প্রাণহানি ঘটে এবং আরও বেশ কয়েকজন জখম হন।
বিএলএ-র দায় স্বীকার ও নিরাপত্তারক্ষীদের অপহরণ
এই ভয়াবহ হামলার দায় স্বীকার করেছে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (BLA)। বিএলএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা সামরিক স্থাপনা, পুলিশ এবং বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে এই অভিযান চালিয়েছে। কেবল আক্রমণই নয়, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যকে অপহরণ করার দাবিও করেছে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। তবে অপহরণের বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও থমকে যাওয়া জনজীবন
হামলা পরবর্তী অরাজকতা রুখতে এবং সশস্ত্র বিদ্রোহীদের অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যাপক অভিযানে নেমেছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী। বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে পুরো প্রদেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের ‘লজিস্টিকস’ (Logistics) ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত
আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্ত সংলগ্ন খনিজ সমৃদ্ধ (Mineral-rich) প্রদেশ বেলুচিস্তানে গত কয়েক দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন (Insurgency) চলছে। বিএলএ এবং অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, বিদেশি নাগরিক এবং অ-স্থানীয়দের ওপর আক্রমণ চালিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এই অঞ্চলের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করলেও স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন ও অধিকারের বিষয়ে উদাসীন।
সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীনা প্রকল্পে হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। শনিবারের এই বড় ধরনের হামলা প্রমাণ করে যে, কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও ওই অঞ্চলে বিদ্রোহীদের সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। পাকিস্তান সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের অভাব এই অস্থিরতাকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।