দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের কর্মস্থল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস (BCS)। কিন্তু সেই মর্যাদাপূর্ণ ক্যাডার সার্ভিসে জালিয়াতি ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অনুপ্রবেশের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। অন্তত এক ডজন ব্যক্তি জাল সনদ এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহার করে ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এই তালিকায় বর্তমানে প্রশাসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন উপসচিব ও পুলিশ সুপার (SP) পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও রয়েছেন। এই জালিয়াতির খবর সামনে আসতেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার নৈতিকতা (Ethics) নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
চাচাকে বাবা বানিয়ে জালিয়াতির হাতেখড়ি
জালিয়াতির এক অভাবনীয় উদাহরণ তৈরি করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব কামাল হোসেন। ৩৫তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা কোটা সুবিধা নিতে নিজের আপন চাচাকে ‘বাবা’ হিসেবে নথিপত্রে উপস্থাপন করেন। দুদকের অনুসন্ধানে এই জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা (Legal Action) করা হয়। সম্প্রতি এই কর্মকর্তা আদালতে জামিন নিতে গেলে আদালত তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সিভিল সার্ভিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন নৈতিক স্খলন পুরো প্রশাসনকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
২৯তম বিসিএসে কোটা জালিয়াতির মহোৎসব
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৯তম বিসিএসে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। এই ব্যাচের অন্তত ছয়জন কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ার সময় কোনো কোটা না থাকলেও, ফল প্রকাশের দীর্ঘ ছয় মাস পর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ম্যানেজ করে নিয়োগ বাগিয়ে নেন। এই জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান প্রশাসনের উপসচিব নাহিদা বারিক, রকিবুর রহমান খান, তোফাজ্জেল হোসেন এবং পুলিশ সুপার খোরশেদ আলম। এছাড়াও ৩৮ ও ৪১তম বিসিএসে জাল সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে আরও তিনজনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে সংস্থাটি। দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন সাফ জানিয়েছেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই এই তদন্ত (Investigation) পরিচালিত হচ্ছে এবং দায়ীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
আবেদ আলী কানেকশন ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
বিসিএস প্রশ্নপত্র ফাঁসের আলোচিত খলনায়ক এবং পিএসসির সাবেক ড্রাইভার আবেদ আলীর সহায়তায় চাকরি নেওয়ার অভিযোগও এখন নতুন করে সামনে আসছে। আবেদ আলীর হাত ধরে ক্যাডার হয়েছেন এমন সন্দেহে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকারিয়া রহমান জিকুর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এরই মধ্যে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে এবং প্রভাব খাটিয়ে মেধাবীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এই সিন্ডিকেট (Syndicate) বছরের পর বছর জালিয়াতি চালিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও কঠোর শাস্তির দাবি
জালিয়াতির মাধ্যমে সিভিল সার্ভিসে আসা কর্মকর্তাদের মানসিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ড. শাহজাহান সাজু। তিনি বলেন, “যাদের বিসিএস ক্যাডার হওয়ার যাত্রাই শুরু হয় জালিয়াতি দিয়ে, তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে দুর্নীতি করা। তারা দেশ ও জনগণের সেবার চেয়ে লুটপাটেই বেশি আগ্রহী হয়।” বিশেষজ্ঞরা দাবি তুলছেন যে, শুধু চাকরি থেকে বরখাস্ত নয়, বরং এই জালিয়াতির মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে তারা রাষ্ট্র থেকে যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন, তা সুদে-আসলে ফেরত নেওয়া উচিত।
বিসিএস ক্যাডার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পিএসসির (PSC) স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার (Security Protocol) আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। ভুয়া সনদের মাধ্যমে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা আরও জোরদার না করলে মেধাবীদের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।